“মানুষ এখন ‘সময় নেই’ বলে—নাকি গুরুত্বটাই আর নেই?”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
একটা সময় ছিল, যখন মানুষ ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করতো। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েও প্রিয় মানুষের একটা ফোন ধরতো, দুই মিনিট কথা বলার জন্য হলেও সময় রাখতো। “খেয়েছো?”, “কেমন আছো?”, “আজ মন খারাপ কেন?”—এই ছোট ছোট কথাগুলোও সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ধরে রাখতো। অথচ এখন? মানুষ খুব সহজেই বলে—“সময় নেই।” প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি সময় নেই, নাকি গুরুত্বটাই আর আগের মতো নেই?বর্তমান পৃথিবী নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, ক্যারিয়ার, হাজারো দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ সত্যিই চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমরা যেসব জিনিসকে গুরুত্ব দিই, সেগুলোর জন্য ঠিকই সময় বের করে ফেলি। ব্যস্ত মানুষও পছন্দের সিরিজ দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, প্রয়োজন মনে করলে রাত জেগেও কারও সঙ্গে কথা বলে। তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—সময় না থাকা কি সত্যিই কারণ, নাকি এটা ধীরে ধীরে একটা অজুহাতে পরিণত হয়েছে?বাস্তবতা হলো, মানুষ সময় বের করে না—মানুষ সময় দেয়। আর সময় দেওয়া নির্ভর করে গুরুত্বের ওপর। যে মানুষটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তার একটা মেসেজের উত্তর দিতে আপনি ব্যস্ততার মাঝেও দুই মিনিট সময় বের করবেন। কিন্তু যাকে গুরুত্ব কম দেওয়া শুরু হয়, তার জন্য “পরে কথা বলি”, “এখন ব্যস্ত আছি”, “সময় পাচ্ছি না”—এই কথাগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়।সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হয়তো তখনই আসে, যখন আপনি বুঝতে পারেন—যে মানুষটা একসময় আপনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিত, এখন তার পাঁচ মিনিট সময়ও নেই। আগে রাত জেগে গল্প হতো, এখন একটা রিপ্লাই পেতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আগে আপনার মন খারাপ বুঝে খোঁজ নিত, এখন আপনি হারিয়ে গেলেও হয়তো খুব একটা খেয়াল করে না। তখন মনে প্রশ্ন আসে—মানুষটা কি সত্যিই এত ব্যস্ত, নাকি আমি আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নই?তবে এটাও সত্য, সব ক্ষেত্রে “সময় নেই” মানেই গুরুত্ব কমে গেছে—এমনটা না। জীবনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। কখনো কখনো মানুষ সত্যিই মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকে, কাজের চাপে ডুবে থাকে, নিজের জীবন নিয়েই যুদ্ধ করতে থাকে। এমন অবস্থায় সে হয়তো আগের মতো সময় দিতে পারে না। কিন্তু পার্থক্যটা একটা জায়গায়—যে মানুষটা সত্যিই গুরুত্ব দেয়, সে ব্যস্ত থাকলেও একটা ছোট খোঁজ রাখে। হয়তো সময় কম দেয়, কিন্তু অনুভূতিটা বুঝিয়ে দেয় যে, “আমি আছি।”আসলে সমস্যা সময় কমে যাওয়া না, সমস্যা হলো চেষ্টা কমে যাওয়া। কেউ যদি সত্যিই আপনাকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সে হয়তো ২৪ ঘণ্টা পাশে থাকতে পারবে না, কিন্তু অন্তত চেষ্টা করবে যোগাযোগ রাখার। কারণ গুরুত্ব থাকলে মানুষ ব্যস্ততার মাঝেও একটা জায়গা ধরে রাখে। আর গুরুত্ব হারিয়ে গেলে অজুহাতগুলো বড় হতে থাকে।আমাদের সমাজেও একটা ব্যাপার খুব সাধারণ হয়ে গেছে—মানুষ সম্পর্কের শুরুতে অনেক সময় দেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ কমে যায়। শুরুতে একটা মেসেজের জন্য অপেক্ষা, ছোট ছোট যত্ন, সারাদিন কথা—সবকিছু থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে যেন সব বদলে যায়। তখন “সময় নেই” কথাটা বারবার শোনা যায়। অথচ একই মানুষকে দেখা যায় অন্য জায়গায় ঠিকই সময় দিতে।এই জায়গাটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত দেয়। কারণ মানুষ ব্যস্ততাকে মেনে নিতে পারে, কিন্তু অবহেলাকে না। আপনি যদি জানেন কেউ সত্যিই ব্যস্ত, তাহলে কষ্ট কম হয়। কিন্তু যখন দেখেন—আপনার জন্য সময় নেই, অথচ অন্যসব কিছুর জন্য সময় আছে, তখন নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হয়।আর একটা কঠিন সত্য হলো—আমরা অনেক সময় ভুল মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিই। যাকে কেন্দ্র করে নিজের সময়, অনুভূতি, গুরুত্ব সবকিছু গড়ে তুলি, সে হয়তো ধীরে ধীরে বদলে যায়। তখন আমরা তার “সময় নেই” কথাটাকে বারবার যুক্তি দিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বুঝি—সমস্যা সময় না, জায়গাটা বদলে গেছে।তবে এই বাস্তবতা থেকে একটা শিক্ষা নেওয়া জরুরি—কারও সময়ের জন্য নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলা ঠিক না। যে মানুষটা আপনাকে সত্যিই মূল্য দেয়, সে অন্তত চেষ্টা করবে। হয়তো প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হবে না, কিন্তু একটা ছোট মেসেজ, একটা খোঁজ নেওয়া, একটা “কেমন আছো?”—এসবই অনেক সময় প্রমাণ করে দেয় আপনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।আমাদেরও উচিত মানুষকে একটু বোঝার চেষ্টা করা। সব পরিবর্তন অবহেলা না, কিছু পরিবর্তন বাস্তবতার কারণেও আসে। তাই কাউকে বিচার করার আগে তার অবস্থাটাও বোঝা দরকার। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার—যেখানে বারবার শুধু অজুহাত, কিন্তু কোনো চেষ্টা নেই, সেখানে হয়তো সত্যিটা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে।দিন শেষে হয়তো সবচেয়ে তিক্ত সত্যিটা এটাই—মানুষের জীবনে সময়ের অভাব কম, গুরুত্বের অভাব বেশি। কারণ যে মানুষটা সত্যিই আপনাকে নিজের মনে করে, সে ব্যস্ততার মাঝেও আপনার জন্য একটু জায়গা রাখবেই। আর যেখানে গুরুত্ব কমে যায়, সেখানে “সময় নেই” কথাটা ধীরে ধীরে সম্পর্কের সবচেয়ে পরিচিত অজুহাত হয়ে যায়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

