“সবাই বলে ‘নিজেকে ভালোবাসো’—কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবহেলা কি আমরা নিজেকেই করি না?”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
আজকাল একটা কথা খুব বেশি শোনা যায়—“নিজেকে ভালোবাসো”, “নিজের যত্ন নাও”,। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায় অনুপ্রেরণামূলক কথা, সুন্দর সুন্দর উক্তি, আত্মভালোবাসা নিয়ে পোস্ট। কিন্তু একটু থেমে যদি নিজেকে প্রশ্ন করি—আমরা কি সত্যিই নিজেকে ভালোবাসি? নাকি সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি ঠিক নিজেকেই?অদ্ভুত একটা বিষয় হলো, আমরা অন্যদের জন্য যতটা ভাবি, নিজের জন্য তার অর্ধেকও ভাবি না। প্রিয় মানুষদের খেয়াল রাখি, তাদের মন খারাপ বুঝি, তাদের কষ্টে পাশে দাঁড়াই। কেউ একটু মন খারাপ করলে বলি—“নিজের যত্ন নিও”, “এত চাপ নিও না”, “বিশ্রাম নাও।” অথচ নিজের ক্ষেত্রে? আমরা ক্লান্ত থাকলেও কাজ করি, ভেঙে পড়লেও হাসি, কষ্ট পেলেও চুপ থাকি। যেন নিজের প্রতি কঠোর হওয়াটাই স্বাভাবিক।একবার ভেবে দেখুন—শেষ কবে আপনি নিজের মনটার খবর নিয়েছেন? শেষ কবে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছেন, “আমি আসলে কেমন আছি?” আমরা অনেক সময় এত ব্যস্ত হয়ে যাই অন্যদের খুশি রাখতে, অন্যদের প্রত্যাশা পূরণ করতে, যে নিজের প্রয়োজনগুলোই ভুলে যাই। নিজের ক্লান্তি, নিজের কষ্ট, নিজের না-পারা—সবকিছু চাপা দিয়ে শুধু চলতেই থাকি।সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা নিজের সঙ্গে খুব কঠোর আচরণ করি। অন্য কেউ একটা ভুল করলে হয়তো আমরা তাকে বুঝি, ক্ষমা করি, বলি—“সমস্যা নেই, সবারই ভুল হয়।” কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে? একটা ছোট ভুলের জন্যও নিজেকে খুব বেশি দোষ দিই। মনে হয়—“আমি কেন এমন করলাম?”, “আমি যথেষ্ট ভালো না”, “আমার আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল।” যেন নিজের প্রতি আমাদের প্রত্যাশার শেষ নেই।আমরা অনেকেই এমন একটা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যেখানে নিজের মূল্যটা অন্যের মতামতের ওপর নির্ভর করে। কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগে, কেউ অবহেলা করলে নিজের ওপর সন্দেহ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে মনে হয়—সবাই কত সুন্দর, সফল, সুখী! আর নিজের জীবনটাকেই ছোট মনে হতে থাকে। ধীরে ধীরে নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি জন্মায়।কিন্তু একটা সত্য হলো—আপনি যাদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করছেন, তারা তাদের জীবনের পুরো গল্প দেখাচ্ছে না। মানুষ সাধারণত নিজের সুন্দর সময়টাই দেখায়, কষ্ট, ভয়, ব্যর্থতা—এসব আড়ালে রেখে দেয়। অথচ আমরা সেই অর্ধেক গল্প দেখে নিজের পুরো জীবনকে বিচার করি। আর এই তুলনা করতে করতেই নিজের ভালো দিকগুলো ভুলে যাই।আরেকটা বড় সমস্যা হলো—আমরা “নিজেকে ভালোবাসা”কে অনেক সময় ভুলভাবে বুঝি। অনেকে মনে করে নিজের কথা ভাবা মানে স্বার্থপর হওয়া। নিজের শান্তির জন্য কিছু করা মানে অন্যদের অবহেলা করা। কিন্তু সত্যিটা একদম উল্টো। আপনি যদি নিজেই ভেতর থেকে ক্লান্ত, ভাঙা, অবহেলিত থাকেন—তাহলে অন্যদেরও পুরোটা দিতে পারবেন না।নিজেকে ভালোবাসা মানে দামি জিনিস কেনা না, সবসময় খুশি থাকা না, কিংবা শুধু নিজের কথা ভাবা না। নিজের প্রতি একটু দয়া দেখানোও আত্মভালোবাসা। ক্লান্ত লাগলে বিশ্রাম নেওয়া, কষ্ট লাগলে সেটা স্বীকার করা, প্রয়োজন হলে “না” বলতে শেখা—এসবও নিজেকে ভালোবাসার অংশ। নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের ভুলকে ক্ষমা করা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়াও খুব জরুরি।আমরা অনেক সময় এমন মানুষদের ধরে রাখি, যারা আমাদের মূল্য দেয় না। শুধু হারানোর ভয় থেকে সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাই, নিজের আত্মসম্মান হারিয়েও কারও মন পাওয়ার চেষ্টা করি। অথচ সত্যিটা হলো—যে মানুষ নিজেকে মূল্য দিতে শেখে না, পৃথিবীও তাকে সহজে মূল্য দেয় না।একটা কঠিন প্রশ্ন নিজেকে করা দরকার—আমি কি নিজের সঙ্গে এমন আচরণ করি, যেটা আমি আমার প্রিয় মানুষটার সঙ্গে করতাম? যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে হয়তো সত্যিই আমরা নিজেকেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করছি।মজার বিষয় হলো, আমরা অনেকেই নিজের কষ্টকে ছোট করে দেখি। ভাবি—“আরও খারাপ অবস্থায় তো মানুষ আছে”, “এটা নিয়ে মন খারাপ করা ঠিক না।” কিন্তু অনুভূতির কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আপনার কষ্ট আপনার জন্য বাস্তব। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা মানে নিজের একটা অংশকে চুপ করিয়ে দেওয়া।তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—নিজেকে ভালোবাসা রাতারাতি শেখা যায় না। এটা একটা অভ্যাস। ধীরে ধীরে শুরু করতে হয়। নিজের জন্য একটু সময় রাখা, নিজের পছন্দের কাজ করা, সবসময় সবাইকে খুশি রাখার চেষ্টা না করা, ভুল করলেও নিজেকে মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়া—এসব ছোট ছোট পরিবর্তন থেকেই শুরু হয়।
কখনো কখনো নিজের কাছেও একটু নরম হওয়া দরকার। কারণ আপনি মেশিন না, আপনি মানুষ। আপনারও খারাপ লাগবে, ক্লান্ত লাগবে, ভেঙে পড়তে ইচ্ছে করবে—এটাই স্বাভাবিক। সবসময় শক্ত থাকা জরুরি না। সবসময় সবার জন্য থাকতে গিয়ে নিজের জন্য হারিয়ে যাওয়া কোনো সাহসিকতা না।
দিন শেষে সবচেয়ে বড় সত্যিটা হয়তো এটাই—পৃথিবীতে সবাই একসময় না একসময় দূরে চলে যেতে পারে, কিন্তু আপনি সারাজীবন নিজের সঙ্গেই থাকবেন। তাই যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি যত্ন দেওয়া দরকার হয়, সেটা আপনি নিজেই। কারণ নিজের ভেতরটা ফাঁকা রেখে বাইরের পৃথিবীকে খুশি রাখা যায়, কিন্তু শান্তি পাওয়া যায় না।তাই মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন—“আমি কি সত্যিই নিজেকে ভালোবাসি, নাকি সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি ঠিক নিজেকেই?”
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR
Sort: Trending
Loading...

