“বন্ধু নয়, সে ছিল সুযোগসন্ধানী—প্রয়োজন ফুরাতেই আসল চেহারা দেখিয়েছে!”
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
জীবনের একটা সময় পর্যন্ত যে মানুষটাকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে হতো, যার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা যেত, যার কাছে নিজের গোপন কথা নির্দ্বিধায় বলা যেত, সেই মানুষটাই একদিন সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। আর এর পেছনে বেশিরভাগ সময় দায়ী থাকে দুটি বিষয়—স্বার্থপরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা।
আজকের পৃথিবীতে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। অনেক মানুষ বন্ধু হয় প্রয়োজনের জন্য, সুবিধার জন্য, কিংবা কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশায়। যতদিন তাদের স্বার্থ পূরণ হয়, ততদিন তারা পাশে থাকে। কিন্তু যেই মুহূর্তে স্বার্থের জায়গাটা শেষ হয়ে যায়, তখন সম্পর্কের আসল চেহারা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
স্বার্থপর মানুষ কখনো প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। কারণ তার কাছে সম্পর্কের চেয়ে নিজের লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে বন্ধুত্বকে মূল্য দেয় না, মূল্য দেয় নিজের প্রয়োজনকে। প্রয়োজন শেষ হলে সে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, যোগাযোগ কমিয়ে দেয়, এমনকি এমন আচরণ করে যেন কোনোদিন পরিচয়ই ছিল না।
আর যখন এই স্বার্থপরতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা যুক্ত হয়, তখন সেই আঘাত আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ শত্রুর আঘাতের জন্য মানুষ প্রস্তুত থাকে, কিন্তু বন্ধুর আঘাতের জন্য কখনো প্রস্তুত থাকে না।
বিশ্বাসঘাতকতা শুধু একটি কাজ নয়, এটি একজন মানুষের ওপর আরেকজন মানুষের বিশ্বাসকে হত্যা করার নাম। যে বন্ধু একসময় আপনার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই যদি আপনার দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, আপনার গোপন কথা অন্যের কাছে বলে বেড়ায়, কিংবা নিজের লাভের জন্য আপনাকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়—তাহলে তার চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিশ্বাসঘাতক মানুষগুলো সাধারণত অপরিচিত কেউ নয়। তারা সেই মানুষ, যাদের আমরা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছি। যাদের জন্য আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। যাদের বিপদে নিজের সুবিধা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছি। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাই প্রমাণ করে দেয় যে আমরা মানুষ চিনতে ভুল করেছিলাম।
অনেক সময় দেখা যায়, দুই বন্ধু একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিল। একজন অন্যজনকে সাহায্য করেছে, সমর্থন দিয়েছে, উৎসাহ দিয়েছে। কিন্তু যখন একজন সফল হতে শুরু করে বা কোনো সুযোগ সামনে আসে, তখন অন্যজনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বার্থপরতা জেগে ওঠে। শুরু হয় হিংসা, প্রতিযোগিতা, ছোট করার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা।
তখন বোঝা যায়, সে কখনো প্রকৃত বন্ধু ছিল না। সে ছিল শুধুমাত্র একজন সুবিধাভোগী, যে বন্ধুত্বের মুখোশ পরে নিজের প্রয়োজন মেটাচ্ছিল।
বাস্তবতা হলো, মানুষ শত্রুর কারণে যতটা না ভাঙে, তার চেয়ে বেশি ভাঙে কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায়। কারণ শত্রুর কাছ থেকে খারাপ আচরণ প্রত্যাশিত, কিন্তু বন্ধুর কাছ থেকে নয়।
যখন কোনো বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন শুধু সম্পর্কটা শেষ হয় না; মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতাটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর নতুন কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় লাগে। মনে হয়, আবার যদি একই ঘটনা ঘটে? আবার যদি কাউকে আপন ভাবার ভুল করি?
এ কারণেই অনেক মানুষ ধীরে ধীরে একাকী হয়ে যায়। তারা মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চায় না। কারণ তারা জানে, ভুল মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখার মূল্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
তবে জীবনের আরেকটি সত্য হলো, প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়ে যায়। যদিও সেই শিক্ষা খুব কষ্টের, তবুও তা মূল্যবান। কারণ এটি আমাদের শেখায় কে সত্যিকারের বন্ধু আর কে শুধুমাত্র সুবিধাবাদী।
যে মানুষটি একসময় বন্ধু ছিল কিন্তু পরে স্বার্থের জন্য শত্রু হয়ে গেছে, তাকে নিয়ে আফসোস করে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই। বরং তার আচরণকে একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করাই ভালো। কারণ তার কারণে আমরা অন্তত বুঝতে পেরেছি, সবাই বন্ধু হওয়ার যোগ্য নয়।
বন্ধুত্বের মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না, স্বার্থ দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত বন্ধু সেই ব্যক্তি, যে আপনার ভালো সময়ে যেমন পাশে থাকবে, খারাপ সময়েও ঠিক ততটাই দৃঢ়ভাবে পাশে থাকবে। যে আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হবে না, বরং গর্বিত হবে। যে আপনার দুর্বলতাকে অস্ত্র বানাবে না, বরং তা রক্ষা করবে।
আজকের দিনে এমন বন্ধু পাওয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। তাই সংখ্যার পেছনে না ছুটে গুণগত সম্পর্ক তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হাজারো স্বার্থপর বন্ধুর চেয়ে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু অনেক বেশি মূল্যবান।
সবশেষে একটা কথাই বলতে হয়—জীবনে শত্রুর সংখ্যা যতই হোক না কেন, তা ততটা ভয়ংকর নয়। ভয়ংকর হলো সেই মানুষগুলো, যারা বন্ধুর পরিচয়ে কাছে আসে, বিশ্বাস অর্জন করে, তারপর সুযোগ বুঝে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কারণ শত্রু সামনে থেকে আঘাত করে, কিন্তু বিশ্বাসঘাতক বন্ধু আঘাত করে পেছন থেকে।
আর তাই, কাল পর্যন্ত যে মানুষটাকে বন্ধু বলে পরিচয় দিতে গর্ব হতো, আজ যদি তার স্বার্থপরতা আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাকে শত্রু মনে হয়, তাহলে দুঃখ পাওয়ার চেয়ে শিক্ষা নেওয়াই ভালো। কারণ কিছু মানুষ জীবনে আসে পাশে থাকার জন্য নয়, বরং মানুষ চেনার শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community