বাঙালি মা এবং স্মার্টফোন: এক অদ্ভুত ভালোবাসার রসায়ন
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বাঙালি জীবনের প্রতিটি ঘরে আজ আর একটি নতুন সদস্যের অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতি—স্মার্টফোন। কিন্তু এই যন্ত্রটি যখন বাড়ির কর্ত্রী, অর্থাৎ বাঙালি মায়ের হাতে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর এবং অত্যন্ত হাসির মহাকাব্য। যে মা একসময় আমাদের পাঁচ মিনিট মোবাইল ঘাটলে "চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যাবে" বলে ধমক দিতেন, আজ তিনিই হয়তো সেই ফোনের সবচেয়ে বড় ভক্ত। মায়ের স্মার্টফোন যাত্রাটি কেবল একটি প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এটি একটি পারিবারিক কমেডি শো। আজ আমরা এই অদ্ভুত ভালোবাসার সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ করব।
চার্জিংয়ের অদ্ভুত দর্শন মায়ের কাছে মোবাইল ফোনের চার্জের হিসেবটা একেবারেই আলাদা। ফোনে ৯৫% চার্জ থাকলেও মায়ের মনে হবে ফোনটা যেকোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাবে। এই ভুতুড়ে ভয়ে মা ফোনটাকে সবসময় চার্জারে লাগিয়ে রাখতে চান। "চার্জে থাক, দরকারের সময় যদি না পাই!"—এটি মায়ের কমন ডায়লগ। আবার ভুলবশত চার্জ কমে ১০%-এ নেমে গেলে মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাদের চোখে ১০% মানে ফোনটা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চলেছে, আর এই পরিস্থিতির জন্য একমাত্র দায়ী ফোনের "খারাপ ব্যাটারি" বা "বেশি টিপাটিপি"। আমাদের ফোনের চার্জ ১% পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সাহসিকতা মায়ের কাছে অবান্তর এবং বিপজ্জনক।নোটিফিকেশন: এক জরুরি সতর্কতা বাঙালি মায়ের ফোনের নোটিফিকেশন সাউন্ড কখনই আস্তে থাকবে না। এটা ভলিউমের সর্বোচ্চ সীমায় থাকে, যাতে পাশের বাড়ি থেকেও শোনা যায় যে মায়ের ফোনে একটা হোয়াটস্যাপ মেসেজ এসেছে। নোটিফিকেশনের টুং-টাং আওয়াজ শোনা মাত্রই মায়ের একটা অদ্ভুত উৎকণ্ঠা শুরু হয়। কে দিল? কী দিল? বিশেষ করে ফ্যামিলি গ্রুপের কোনো মেসেজ হলে তো কথাই নেই, চশমা খুঁজে বের করে, ফোনের স্ক্রিনটা নাকের খুব কাছে নিয়ে এসে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু হয়। এই আওয়াজগুলো বাড়ির অন্য সবার জন্য বিরক্তিকর হলেও মায়ের কাছে তা যেন কোনো জরুরি খবরের সতর্কতা।ভিডিও কলের হাস্যকর কোণ বাঙালি মা যখন ভিডিও কল করেন, তখন ফ্রেমের অবস্থা হয় সবথেকে মজার। ক্যামেরাটা হয় মায়ের থুতনির ঠিক নিচে থাকে, ফলে আমরা শুধুমাত্র মায়ের বিশাল নাক আর সিলিং ফ্যান ঘুরতে দেখি। কখনো বা ক্যামেরাটা একদম ছাদের দিকে তাক করা থাকে। "মা, ক্যামেরাটা সোজা করো, তোমাকে দেখা যাচ্ছে না!"—এই অনুরোধের উত্তরে মা ফোনটাকে আরও অদ্ভুতভাবে ঘোরাতে থাকেন, কিন্তু নিজের মুখটা ফ্রেমে আনতে পারেন না। তাদের কাছে ভিডিও কল মানে নিজের মুখ দেখানো নয়, বরং পুরো ঘর আর পরিবেশটা অপর প্রান্তের মানুষকে দেখানো, এমনকি তারা সেটা দেখতে চাক বা না চাক।সব রোগের এক ওষুধ: "মোবাইল কম দেখ" এটি বাঙালি মায়ের সবথেকে বিখ্যাত এবং সার্বজনীন যুক্তি। মাথা ব্যথা? মোবাইল কম দেখ। পেট খারাপ? সারাদিন মোবাইল ঘাটলে এমনই হবে। পড়া মনে থাকছে না? সবই ওই ফোনের দোষ। জিরো পাওয়ারের চশমা লেগেছে? ওই মোবাইলই চোখটা খেল। অবাক করার মতো বিষয় হলো, মা নিজেই সারাদিন ফোনে নানারকম রান্নার রেসিপি বা ভজন শুনছেন, কিন্তু আমাদের যেকোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার মূল কারণ হিসেবে অবলীলায় আঙুল তোলেন আমাদের ফোনের দিকে। এটি তাদের জন্য এক ধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল।হোয়াটস্যাপ স্ট্যাটাস আর ফ্যামিলি গ্রুপ মায়ের হোয়াটস্যাপ প্রোফাইল পিকচার বা স্ট্যাটাস আপডেটের হিসেবটাও অনন্য। কখনো হয়তো কোনো ধর্মীয় বাণী, কখনো নিজের কোনো গম্ভীর ছবি, আবার কখনো নাতির একটা ছবি—ব্যাস, এটাই মায়ের স্ট্যাটাস। ফ্যামিলি গ্রুপে যেকোনো গুজব বা ভুয়া খবর ফরওয়ার্ড করার ক্ষেত্রেও মা সবার আগে। "সকালবেলা এই মন্ত্রটি দশজনকে পাঠালে শুভ হবে"—এই ধরনের মেসেজ ফরওয়ার্ড করা মায়ের একটা অলিখিত দায়িত্ব। আর যদি কেউ গ্রুপে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মেসেজে উত্তর না দেয়, তবে মা সাথে সাথে তাকে পার্সোনাল চ্যাটে মেসেজ বা কল করে বকা দেবেন—"গ্রুপে মেসেজ দিয়েছি, দেখিসনি?"
রান্নার রেসিপি আর ইউটিুবের মোহ মায়ের ফোন ব্যবহারের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ইউটিউব। তবে সেটা গান শোনার জন্য নয়, নানারকম অদ্ভুত রান্নার রেসিপি দেখার জন্য। "আজকে ইউটিউবে একটা নতুন চালের গুঁড়োর পিঠা দেখলাম,"—বলেই মা রান্নাঘরে ঢুকে পড়বেন। যদিও রান্নার শেষে সেটা ইউটিউবের মতো দেখতে হয় না, কিন্তু মায়ের রান্নার প্রতি এই নতুন উৎসাহ সবই ওই স্মার্টফোনের কল্যাণে। তাছাড়া নানারকম স্বাস্থ্য টিপস বা "পাঁচ মিনিটে ঘর পরিষ্কারের উপায়" দেখার জন্যও ইউটিউব মায়ের এক বিশ্বস্ত সঙ্গী।
ফোনের লক আর ভুলে যাওয়া পাসওয়ার্ড মায়ের ফোনের পাসওয়ার্ড মনে রাখাটা আর এক মহাযজ্ঞ। কখনো হয়তো আঙুলের ছাপ দিয়ে লক খোলেন, কিন্তু যদি সেটা কোনো কারণে কাজ না করে, তবে পাসওয়ার্ড মনে করার জন্য মা বাড়ির সবাইকে ডাকবেন। প্যাটার্ন লক হলে তো আরও বিপদ। "কেমন যেন একটা 'L' এর মতো ছিল না রে?"—মায়ের এই প্রশ্নে আমাদেরও মাথা ঘুরে যায়। অবশেষে কয়েকবার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর যখন ফোন লক হয়ে যায়, তখন মায়ের অসহায় মুখটা দেখলে হাসব না কাঁদব বোঝা যায় না।
মায়ের 'গোপন' আসক্তি এতক্ষণ তো মায়ের অদ্ভুত অভ্যাস নিয়ে কথা হলো, কিন্তু একটা বিষয় মানতেই হবে—মা এখন ফোনের প্রতি অনেকটা আসক্ত। রাতে ঘুমানোর আগেও হয়তো একবার ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রোল করেন বা পছন্দের কোনো সিরিয়ালের পুরানো এপিসোড দেখেন। আমরা যেমন গেমে আসক্ত, মা হয়তো তেমনি কোনো নির্দিষ্ট কন্টেন্টে আসক্ত। এই আসক্তি কখনো কখনো মায়ের দৈনন্দিন কাজেও দেরি করিয়ে দেয়, আর তখন মা আমাদের ওপরেই চটে যান।
বাঙালি মা আর স্মার্টফোনের এই সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে আছে প্রচুর হাসির খোরাক, কিছুটা বিরক্তি, আর অনেকখানি ভালোবাসা। প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মায়ের ফোন ব্যবহারের এই চিরন্তন বাঙালি ধরণটা আমাদের আজীবন হাসাবে। এই অদ্ভুত অভ্যাসগুলোই প্রমাণ করে যে মা যাই করুক না কেন, সব কিছুর পেছনেই থাকে তাঁর সরলতা আর আমাদের প্রতি ভালোবাসা। তাই মায়ের নোটিফিকেশনের টুং-টাং বা ভিডিও কলের উল্টো কোণ—এগুলো সবই বাঙালি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য এবং আনন্দদায়ক অংশ হিসেবেই থেকে যাবে। মায়ের এই স্মার্টফোন যাত্রাটা আমাদের সবাইকে একটা কথাই মনে করিয়ে দেয়—মা মা-ই হয়, সে হাতে স্মার্টফোন নিক বা খুন্তি।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community