"ছোটবেলার সেই শুক্রবার—এক টুকরো শান্তি, এক টুকরো ভালোবাসা"
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
শুক্রবার—এই শব্দটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এখনকার ব্যস্ত জীবনে শুক্রবার মানেই হয়তো একটু বিশ্রাম, একটু ঘুম, অথবা নিজের মতো করে সময় কাটানো। কিন্তু ছোটবেলার শুক্রবার ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম—আরও রঙিন, আরও আবেগময়, আরও আপন।ছোটবেলায় শুক্রবার মানেই ছিল সপ্তাহের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার কোনো তাড়া থাকত না। স্কুল বন্ধ, তাই ভোরবেলার অ্যালার্মের কোনো ভয় নেই। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের আলোয় চোখ মেলে ধীরে ধীরে উঠতাম—কোনো চাপ নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই। মনে হতো, আজ পুরো দিনটাই শুধু আমার।মায়ের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরম ভাত আর ভাজির গন্ধ যেন শুক্রবারের সকালকে আরও মধুর করে তুলত। মা হয়তো একটু বিশেষ কিছু রান্না করতেন—মুরগির মাংস, খিচুড়ি, অথবা গরম গরম পরোটা। পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো ছিল সত্যিই অমূল্য। তখন বুঝতাম না, কিন্তু এখন মনে হয়—সেই সময়গুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে শান্ত আর সুখের সময়।শুক্রবার মানেই ছিল দুপুরের নামাজের প্রস্তুতি। বাবা বা বড় ভাইয়ের সাথে মসজিদে যাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ ছিল। নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরে, আতর লাগিয়ে, সবাই মিলে একসাথে মসজিদে যাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো আজও চোখে ভাসে। মসজিদ থেকে ফিরে এসে ঠান্ডা শরবত বা দই খাওয়ার ছোট ছোট আনন্দগুলো যেন মন ভরে দিত।দুপুরের খাবারের পর শুরু হতো আরেক রকম আনন্দ—দুপুরের ঘুম। যদিও ছোটবেলায় ঘুমাতে খুব একটা ভালো লাগত না, তবুও মায়ের বকুনিতে শুয়ে পড়তাম। জানালার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, হালকা বাতাস, আর দূরের কোনো টিভির শব্দ—সব মিলিয়ে একটা অলস, শান্ত পরিবেশ তৈরি হতো। মাঝে মাঝে ঘুম না এসে চুপচাপ গল্পের বই পড়তাম বা কল্পনার জগতে হারিয়ে যেতাম।বিকেল হলেই শুরু হতো আসল মজা। পাড়ার বন্ধুদের সাথে মাঠে ছুটে যাওয়া—ক্রিকেট, ফুটবল, লুকোচুরি, অথবা স্রেফ আড্ডা। সময়ের কোনো হিসাব থাকত না। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত খেলাধুলা চলত। তখন মোবাইল ফোন ছিল না, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না—তবুও আমাদের আনন্দে কোনো কমতি ছিল না। বরং সেই সরল আনন্দটাই ছিল সবচেয়ে খাঁটি।সন্ধ্যার সময় ঘরে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে টিভির সামনে বসা ছিল আরেকটা বড় আকর্ষণ। বিশেষ করে শুক্রবারের নাটক বা সিনেমা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষা করত। পুরো পরিবার একসাথে বসে টিভি দেখার সেই মুহূর্তগুলো আজকের দিনে খুব একটা দেখা যায় না। তখনকার সেই ছোট্ট টিভির সামনে বসে যে আনন্দ পেতাম, আজকের বড় স্ক্রিনেও যেন সেই অনুভূতি পাওয়া যায় না।রাতের খাবার শেষে ছাদে উঠে বসা বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের তারা দেখা—এসবও ছিল শুক্রবারের এক বিশেষ অংশ। হালকা বাতাস, দূরের আজানের সুর, আর পরিবারের সাথে গল্প করা—সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম শান্তি পেতাম। মনে হতো, এই সময়টা যেন কখনো শেষ না হয়।ছোটবেলার শুক্রবারগুলো শুধু একটা দিনের স্মৃতি নয়, বরং একটা পুরো অনুভূতির নাম। সেখানে ছিল পরিবার, ভালোবাসা, সরলতা আর নির্ভেজাল আনন্দ। তখন জীবনে কোনো জটিলতা ছিল না, কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না। ছোট ছোট জিনিসেই খুশি হয়ে যেতাম, আর সেই খুশিটাই ছিল সবচেয়ে সত্যিকারের।এখন বড় হয়ে বুঝি—সেই শুক্রবারগুলো আসলে শুধু ছুটির দিন ছিল না, ছিল জীবনের একেকটা মূল্যবান অধ্যায়। সময়ের সাথে সাথে সব কিছু বদলে গেছে—ব্যস্ততা বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনও মনকে ছুঁয়ে যায়।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে আবার সেই ছোটবেলার শুক্রবারে ফিরে যেতে। আবার সেই নির্ভার সকাল, সেই মায়ের ডাক, সেই বন্ধুদের সাথে খেলা—সব কিছু আবার একবার অনুভব করতে। কিন্তু সময় তো আর ফিরে আসে না, শুধু স্মৃতিগুলোই থেকে যায়।তবুও, এই স্মৃতিগুলোই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। যখন জীবনের চাপ আমাদের ক্লান্ত করে তোলে, তখন এই ছোটবেলার শুক্রবারগুলোই মনে করিয়ে দেয়—জীবন আসলে খুব সহজ আর সুন্দর ছিল, আর এখনও হতে পারে, যদি আমরা সেই সরলতাটুকু ধরে রাখতে পারি।
ছোটবেলার সেই শুক্রবার—হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছে। আর যতদিন বেঁচে থাকব, এই স্মৃতিগুলোই আমাদের মনে একটুখানি হাসি আর একটুখানি শান্তি এনে দেবে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

