নিষিদ্ধ বাক্স ( পর্ব ১ )
Image Created by Adobe Firefly AI
সন্ধ্যা থেকেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে ছিল। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। গ্রামের কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে গেল, আর চারদিকে নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা। প্রায় ছয় বছর শহরে থাকার পর দাদার মৃত্যুর খবর শুনে আমি আবার ফিরে এলাম আমাদের পুরোনো বাড়িতে।
বাড়িটি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে বিশাল পুরোনো গাছ, ভাঙা দেয়াল, আর আগাছায় ভরা উঠান। এত বছর কেউ এখানে থাকেনি, তবুও মনে হচ্ছিল বাড়িটির ভেতর যেন এখনও কেউ বাস করে।
সারাদিন ঘর পরিষ্কার করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এলো। ধুলো জমে থাকা পুরোনো আসবাবপত্র, মাকড়সার জাল আর বিবর্ণ পারিবারিক ছবিগুলো দেখে বারবার মনে হচ্ছিল সময় যেন এখানে থেমে আছে।
রাত একটু গভীর হলে আমি চিলেকোঠায় উঠলাম। অন্ধকার ঘরটিতে একটি পুরোনো লণ্ঠন জ্বালিয়ে চারদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একটি ছোট কাঠের দরজা। আগে কখনও এই দরজাটি দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না।
দরজাটি বন্ধ ছিল, কিন্তু কাঠ এতটাই পুরোনো হয়ে গিয়েছিল যে সামান্য ধাক্কাতেই খুলে গেল। ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো সিন্দুক, ছেঁড়া বই আর ধুলোয় ঢাকা একটি মাঝারি আকারের কাঠের বাক্স।
কী এক অদ্ভুত কারণে আমার চোখ বারবার সেই বাক্সটির দিকেই চলে যাচ্ছিল।
বাক্সটির গায়ে খোদাই করা ছিল একটি চোখের আকৃতি। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের মতো নকশা দেখে শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন অনেক বছর আগে ইচ্ছে করেই এটিকে লুকিয়ে রেখেছিল।
আমি ধীরে ধীরে বাক্সটির ওপর জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার করলাম।
ঠিক তখনই বাক্সটির নিচে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ দেখতে পেলাম।
কাগজটি হাতে তুলে পড়তেই আমার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
"সূর্য ডুবে যাওয়ার পর এই বাক্স কখনও খুলবে না।"
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর নিজের মনেই হেসে বললাম,
"এগুলো নিশ্চয়ই কাউকে ভয় দেখানোর জন্য লেখা হয়েছে।"
কৌতূহল আমাকে আর থামতে দিল না।
আমি ধীরে ধীরে বাক্সের ঢাকনাটি তুললাম।
কাঠের কবজাগুলো কর্কশ শব্দ করে খুলে গেল।
ভেতরে ছিল মাত্র তিনটি জিনিস।
একটি চোখের আকৃতির রুপার হার।
একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি, যেখানে পাঁচজন মানুষ এই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
আর একটি ছেঁড়া মলাটের পুরোনো ডায়েরি।
আমি ডায়েরিটি হাতে নিতে যাচ্ছিলাম...
ঠিক তখনই পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ হঠাৎ নিভে গেল।
চারদিক মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে ডুবে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর নিচতলা থেকে ভেসে এলো কারও ধীর পায়ের শব্দ।
টক...
টক...
টক...
আমার বুকের ধুকপুকানি যেন থেমে গেল।
কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম...
সেই রাতে বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না।
চলবে...