আলপনায় বর্ষবরণ
নমস্কার বন্ধুরা, আশা করছি আপনারা সকলে সুস্থ আছেন।। আজকে আমি আপনাদের সকলের সাথে শেয়ার করতে চলেছি চৈত্র মাসের শেষ দিনের শেষ মুহূর্তগুলো। গতকাল যেখানে শেষ করেছিলাম তার পর থেকেই লিখছি।
যাইহোক ওখান থেকে বেরিয়ে বাড়িতে ঢুকিনি। রাস্তাতেই ছিলাম কিন্তু বাবার সাথে ছিলাম। বিষয়টা হল বৈশাখ মাসের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন বিকেল থেকে প্রত্যেক বছর আমাদের ঘূর্ণি পুতুল পট্টি এলাকা জুড়ে আলপনা দেয়া হয়।। কৃষ্ণনগর চারুকলা সোসাইটির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে বাপি কাকা এবং অমিত কাকার সমস্ত ছাত্রছাত্রীবৃন্দ খুবই উৎসাহ সহযোগে প্রতিবছর এই কর্ম সম্পূর্ন করে থাকেন।
ওনাদের সহযোগিতায় থাকে ঘুর্নির প্রত্যেক শিল্পীরা। বিশেষ করে আমার বাবা এবং আমার সুবীর জেঠু। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যারা ঘন্টার পর ঘন্টা বিকেল থেকে কাজ করে যাচ্ছে ,আলপনা দিচ্ছে তাদের সমস্ত পরিষেবা ঘূর্ণি থেকে দেয়া হয়। তাদের বিকেলের টিফিন থেকে শুরু করে জলের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাতের খাবার সমস্ত পরিষেবা দেওয়া হয়। সাথেই তারা যাতে সুস্থভাবে কোনরকম উৎশৃংখল পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয়ে রাস্তাতে আলপনাটা দিতে সক্ষম হয় ,সেটা খেয়াল রাখা হয়।
এ কারণে ওই ১০ ঘণ্টা মতো সময় রাস্তা পুরো ব্লক থাকে। কোনরকম গাড়ি ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারে না, স্বাভাবিক বাঙালি মানুষ যেদিকে পায়, সেদিকে জায়গা খুঁজে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাই তাদের কেও সামলে রাখতে হয় ,এসব কাজে সবাই মিলে ঝাপিয়ে নেমে পড়ে। দারোয়ানের মতন দাঁড়িয়ে থেকে কিংবা চেয়ার দিয়ে গার্ড দিয়ে কিছুটা বকাবকি ঝামেলা করে সবকিছুর মধ্যে দিয়েই এই পরিষেবা দেয়া হয়।
এবারেও সেটা হয়েছে। আমি তাই সোজা মার্কেট থেকে চলে এসেছিলাম আমাদের দোকানের সামনে। আমাদের পুতুল পট্টির শোরুমটা সামনে রাস্তাটাতেই পুরোপুরি আলপনাটা হয় ওখানে। এবার মাইকেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে ।গান বাজনা আবৃত্তি যে যা করবে ।সকলের উদ্দেশ্যেই, যাতে ছোট ছোট বাচ্চারা উৎসাহ পায়। আমি যাওয়ার পর কিছুক্ষন এনাউন্সমেন্ট করলাম। বাচ্চাদের নিজের কথা দিয়ে কিছুটা উৎসাহ দেয়ার চেষ্টা করলাম ।সকলের সাথে সকলের অভিভাবক এবং স্যারেরা ছিল। সাথে ছিল ঘূর্ণি শিল্পীরা। বাচ্চারা যারা গান ,আবৃত্তি করে তারাও অংশগ্রহণ করল।
সকলের মাঝে একত্রিতভাবে এইভাবে ওরা কাজ করে চলেছে, এটা দেখেও ভালো লাগছিল কারণ ছোট থেকেই বাচ্চাদের শেখানো উচিত ,কিভাবে দলগতভাবে সংঘবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হয়। নিজের শহরকে একটা সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ চৈত্র মাসের শেষের দিন এ, এটা সত্যিই একটা অন্যরকম বিষয়। অনেকে ভাবতেই পারেন, এটা করে কি হবে ,তবে করে এটা অনেক কিছু শিখতে পারছে ছেলেমেয়েরা।
বিশেষ করে বলা যায়, অত বড় রাস্তায় অত বড় একটা আলপনা কিভাবে দিতে হয় ,তার একটা জ্যামিতিক ক্যালকুলেশন অবশ্যই রয়েছে।। যেকোনো আর্টের ক্ষেত্রেই জ্যামিতি দরকার। সেটা ওরা বুঝে কি সুন্দর কাজ করে চলেছে। আলপনা যেমন শিখতে পারছে, এই বিষয়টা বুঝতেও তারা পারছে। সাথে সবার সাথে তাল মিলিয়ে প্রাকৃতিক এবং সামাজিক সমস্ত ঝামেলা
পেরিয়ে ওরা নিজের কাজে যেভাবে একাগ্র হয়ে উঠেছে, তা তাদের আলপনায় প্রমাণিত।
এসব কাজের ফাঁকে ফোন করে নিয়েছিলাম দেবদাকে। চক্রবর্তী দেব বলে দাদার পেজ আছে, ফেসবুকে আর ইনস্টাগ্রামে। অনেকজন ভিউয়ার্স ,অনেক ফলোয়ার্স। দাদার সাথে একটু পরিচয় থাকায় যখনই ডাকলাম ,দাদা সাথে সাথে চলে আসল। বাচ্চাদের এবং স্যারেদের সাথে শিল্পীদের কিছুটা ইন্টারভিউ নিল, কিছু ছবি এবং ভিডিও ক্যাপচার করল ,যাতে পেজে ছাড়তে পারে। এটা আমার প্রথম থেকেই ভাবনা ছিল ।কারণ আমার মনে হয় পরের দিন সকাল বেলায় যখন বাচ্চারা ছেলে-মেয়েরা যখন নিজেদের এরকম একটা জায়গায় দেখতে পাবে, ওরা উৎসাহ পাবে। ওদের কাজের প্রতি একটা উৎসাহ জাগবে।
যখন বাজে এগারোটা ,তখন রুটি আর আলুর দম খেয়ে আমাকে আর ঈশানকে বাবা বাড়িতে নামিয়ে দিল ।কারণ অনেকক্ষণই আমরা ডিউটি দিলাম। আমাদের আসার পরও ছেলেমেয়েরা কাজ করেছে, রাত একটা দুটো অবদি। যাইহোক আলুর দমটা কিন্তু ওখানেই রান্না হচ্ছিল ।খুবই ভালো খেতে হয়েছিল।
এভাবেই কিন্তু বৈশাখ মাসের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র মাসটা শেষ হলো ,বাংলার ১৪৩২ সাল এত সুন্দরভাবে শেষ হওয়ার পেছনে, সকলের অবদান রয়েছে। সকলকেই মনে মনে ধন্যবাদ।






