"আরও একটা দায়িত্ব পালনের চেষ্টায় কাটলো অর্ধেক দিন, বাকি অর্ধেক কাটলো মনখারাপ নিয়ে"
![]()
|
|---|
Hello,
Everyone,
আমি জানি না এটা সকলের জীবনে সত্যি কিনা, তবে আমি খেয়াল করে দেখেছি আমার জীবনের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। আমি যখন কোনো একটা জিনিসের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাই, ঠিক তখনই কোনো না কোনো কারনে, সেই জিনিসটা আমাকে করতে হয়।
সেটা ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও কোথাও যাওয়া হোক, কারোর সঙ্গে ব্যক্তিগত কারণে কথা বলতে না চাওয়া সত্ত্বেও কথা বলা হোক, এমনকি মন খারাপ থাকলে যখন চুপচাপ একলা থাকতে ইচ্ছা করে, দেখি তখনই হয়তো বাড়িতে আত্মীয় স্বজন বা এমন ব্যক্তিরা চলে আসে যে, সেই মুহূর্তে তাদের সাথে কথা বলতে বাধ্য হই। এইরকমই ছোট্ট ছোট্ট আরও নানান ঘটনা আছে, যেগুলো কখনো কখনো আমাকে বাধ্য হয়ে করতে হয়।
![]()
|
|---|
আপনারা অনেকেই জানেন, মাঝখানের কয়েকটা বছর আমার জন্য বেশ কঠিন পরিস্থিতি ছিলো। সেটা বাবার অসুস্থতা থেকে শুরু করে, আমার ঠাকুমার মৃত্যু। এরপর দিদি হাজবেন্ডের ব্রেন সার্জারি, দীর্ঘদিন যাবৎ শ্বশুরমশাইয়ের অসুস্থতা, এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে বেশ কঠিন মুহূর্ত পার হয়েছে।
টানা ৪ বছর শ্বশুর মশাইকে নিয়ে এতোবার হসপিটালে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো, প্রচুর টেস্ট করানো, এই সমস্ত কিছু করতে করতে আর যেন ডাক্তার দেখানো বলুন কিংবা হসপিটালে যাওয়া সমস্ত কিছুতেই বিরক্ত অনুভব করি।
কিন্তু পরিস্থিতি আবার আমাকে বাধ্য করছে সেই কাজগুলি করার জন্য। আসলে কিছু দায়িত্ব থাকে যেগুলো চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি সেগুলো আমি পালন না করি হয়তো আমাকে কেউ বাধ্য করবে না, তবে মানুষ হিসেবে নিজের ভিতরে যে বিবেক আছে তা বারংবার আমাকে মনে করিয়ে দেবে কাজটা বোধহয় আমি ঠিক করলাম না। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই যেন এই সকল কাজ করে চলেছি আজও।
![]()
|
|---|
গত দুই তিন দিন ধরে শাশুড়ি মা ডাক্তার দেখাবে বলছিলেন। এর মধ্যে ননদের সাথে কথা বলে নার্ভের ডাক্তারের সাথে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট ঠিক করা হয়েছে। যেখানে আজ দুপুর আড়াইটার সময় যাওয়ার কথা ছিলো। অন্যদিকে মে দিবস উপলক্ষে শুভর আজ অফিস ছুটি ছিলো। প্রথমে ওকেই বলেছিলাম শাশুড়ি মা কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ও আমাকে যেতে বললো।
আসলে যেহেতু শাশুড়ি মা ডাক্তার দেখাবেন, তাই তার সমস্যা গুলো হয়তো ছেলের উপস্থিতিতে তিনি ভালোভাবে ডাক্তারের কাছে বলতে পারবেন না, হয়তো লজ্জায় কিছু কথা এড়িয়ে যাবেন, এইসব ভেবে শুভ আমাকেই সাথে যেতে বললো। সেটা বুঝে আমিও আর আপত্তি করিনি। কোথাও একটা মনে হলো আমি গেলেই হয়তো শাশুড়ি মা একটু বেশি কমফোর্টেবল থাকবেন।
যেহেতু ছুটির দিন, তাই একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। তারপর এক এক করে ঘরের কাজ করার পর, ব্রেকফাস্ট শেষ করে, তাড়াহুড়ো করে দুপুরের রান্না শেষ করেছিলাম। শাশুড়ি মা বাইরের দিকে কিছু কাজ গুছিয়ে পুজো দিতে চলে গিয়েছিলেন। আমি স্নান করতে যাবো তার একটু আগে শুভ এসে বললো শুভর বন্ধু অর্থাৎ রাজার মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ওনাকে নিয়ে ওরা হসপিটালে যাচ্ছে।
সত্যিই মানুষের ভাগ্য কেমন হয়ে থাকে সেটাই ভাবছিলাম। শাশুড়ি মায়ের থেকে অনেক ছোট এই কাকিমা। অথচ কত বড় অসুখে আজ তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, সেটাই আলোচনা করছিলাম আমি আর শুভ। সদ্য বাবাকে হারিয়েছে শুভ, অন্যদিকে বন্ধুর মায়ের এমন অবস্থায় ওকে বেশ চুপচাপ মনে হচ্ছিলো। এমনি করেই হয়তো জীবনের বাস্তবতা গুলো একটু একটু করে চুপ করিয়ে দিতে থাকে আমাদের।
![]()
|
|---|
যাইহোক স্নান সেরে তৈরি হয়ে শাশুড়ি মা কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। দুপুর আড়াইটার সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছে, সেই সময় রাস্তাঘাটে গাড়ির সংখ্যা অনেক কম থাকে, তাই আমাদেরকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। তারপর একটা টোটোগাড়ি পেয়ে আমরা রওনা করলাম।
সেখানে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে নি। পৌঁছে যখন রিসিপশনে জিজ্ঞাসা করলাম তখন জানতে পারলাম ডাক্তার ইতিমধ্যেই এসে পড়েছেন এবং পেশেন্ট দেখাও শুরু করেছেন। শাশুড়ি মায়ের নাম বলাতে ওনরা আমাদেরকে একটু বসতে বললেন। একটু বাদে শাশুড়ি মায়ের নাম ধরে ডাকলো এবং একটা রুমের মধ্যে নিয়ে ওনার ব্লাড প্রেসার, ওজন ইত্যাদি চেক করা হলো।
![]()
|
|---|
তারপর আমাদের ছোট্ট একটা টোকেন দেওয়া হলো। সেটা নিয়ে আমরা ডাক্তারের রুমের বাইরে অপেক্ষা করলাম। তারপর আমাদের সিরিয়াল নাম্বার আসলে, ভিতরে ঢুকে ডাক্তারের কাছে শাশুড়ি মায়ের সমস্ত সমস্যার কথা বলা হলো। প্রথমত যে যে কাজগুলো শাশুড়ি মা কে করতে বারণ করা হয়েছে, সেগুলো উনি করতে পারবেন না এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
পান খাওয়ার নেশা তিনি এ জীবনে কোনো কিছুর বিনিময়েই ছাড়তে পারবেন না। তবে ডাক্তার বলে দিয়েছে সেটা না করলে ওষুধে কাজ হবে না। যাইহোক তিনি এমআরআই ও নার্ভের আরেকটা টেস্ট করতে বলেছেন, সাথে ওষুধ দিয়েছেন।
যে ওষুধ তিনি খাচ্ছিলেন, সেই ওষুধেরই পাওয়ার একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর সাথে আরও কয়েকটা ওষুধ দিয়েছেন। যাইহোক ডাক্তার দেখানোর পর্ব শেষ করে বাড়ি থেকে ফিরলাম।
![]()
|
|---|
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করার পরে শুভ আবার ওর বন্ধুকে ফোন করেছিল। তখন শুনলাম কাকিমার অবস্থা বেশ খারাপ। অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। সিটি স্ক্যান করার জন্য কাকিমাকে নিচে নিয়ে যেতে হবে, তবে অক্সিজেন খোলা যাচ্ছে না একটুও। আর অক্সিজেন চলাকালীন সিটি স্ক্যান করা সম্ভব নয়, তাই ডাক্তারেরা একটু অপেক্ষা করছেন।
খবরটা শোনার পর থেকে হসপিটালে শ্বশুর মশাইকে নিয়ে কাটানো দিনগুলোর কথাই মনে পড়ছিলো। সত্যি কথা বলতে ডাক্তার দেখানো, টেস্ট করার জন্য লাইনে দাঁড়ানো, ডাক্তারের সাথে কথা বলা, ওষুধের দোকানের লাইন দেওয়া, এই সমস্ত কাজ এতো বেশি করেছি যে, এখন এই সম্পর্কে কথা বললেই যেন আমার ভেতর থেকে কেমন একটা অস্বস্তি হয়, সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।
![]()
|
|---|
যাইহোক এরপর সন্ধ্যা থেকে কাকিমাকে নিয়েই কথাবার্তায় অনেকটা সময় পার হয়েছে। মাঝেমধ্যে শুভর থেকে খবর জানতে চাইছি, কারণ সকলে মিলে যদি হসপিটালে ফোন করে একই খবর জানতে চাই, তাহলে তা বারংবার বলাও কতটা অস্বস্তি সেটা আমরা জানি। তাই বারবার শুভ ফোন করে ওর বন্ধুকে বিরক্ত করতে চাইছে না। কারণ আমাদের মতো আরও অনেকেই কাকিমার খবর নেওয়ার জন্য ওকে ফোন করছে নিশ্চয়ই।
এই পর্যন্ত তবুও ঠিক ছিলো। তবে কিছুক্ষণ আগে শুভ এবং ওর আরও দুজন বন্ধু হসপিটালের উদ্দেশ্য রওনা করেছে। কাকিমার অবস্থা বেশ খারাপ। আর এই সময় যদি বন্ধুর পাশে না থাকে তাহলে বোধহয় বন্ধুত্বের মর্যাদা রাখা হয় না। সাড়ে দশটার পর ওরা হসপিটালে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছে।
আমারও মনটা ভীষণই খারাপ লাগছিলো। তবে অনেকটা রাত হয়ে যাবে বলে আমি আর যাইনি। পোস্ট লিখতেও ইচ্ছা করছিলো না, কিন্তু তবুও ভাবলাম মনের কথাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করলে হয়তো কিছুটা হালকা লাগবে। **আমি জানি কাকিমার পক্ষে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া কোনোদিনও সম্ভব নয়। তবে উনি এতো কষ্ট পাচ্ছেন যে, তার শুনেই বেশ খারাপ লাগছে।
বিশেষ করে এই সময় হসপিটালে থাকতে কতখানি অসহায় লাগে, নিজেদের ক্ষেত্রে সেটা বুঝতে পেরেই বোধহয় মন খারাপের মাত্রাটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। যাইহোক আমাদের সকলের জন্য শারীরিক সুস্থতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোধহয় এইরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আরও বেশি করে অনুভব করি।
তাই আপনাদের সকলেরই সুস্থতা কামনা করি। ভালো থাকবেন সকলে। শুভরাত্রি।







Curated by : @lirvic