কথা - এক্ অব্যক্ত শব্দ সমষ্টি!

আমার নাম কথা! তবে, শৈশব থেকেই আমি লোক সমক্ষে কম, আর নিজের সাথে বেশি কথা বলি!
কখনও ঘরে একলা থাকলে, সেই নিঃশব্দ অক্ষরগুলোয় একটু নিচু কন্ঠস্বর সংযোজন হয়, এই যা পার্থক্য!
অনেকেই আমার নাম নিয়ে মজা করে, তাদের সাথে সেভাবে কথা বলিনা বলে;
কিন্তু আমি জানি আমি সারাদিন নিজের সাথে কত কথা বলি!
ঠিক সেই কারণে, চেনা অচেনা মানুষদের কটাক্ষপাত তেমনি গায়ে মাখি না।
মানুষের সাথে ভাবালাপ করে দেখেছি, জানেন, নিজেদের কথাগুলো চাপা দিয়ে তাদের কথার প্রেক্ষিতে দেওয়া উত্তরগুলো নিয়ে অযথা অপবাদ দিতে তারা সিদ্ধহস্ত! একাধিকবার এইরকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, তাই আর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে আলাপচারিতা করতে এখন ভালো লাগে না।
একমাত্র আমার মা আমাকে বুঝতেন, কিন্তু সেও যখন আমায় একা ফেলে চলে গেলো, নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছিলাম বই এর মাঝে!
আর সেই লেখাপড়ার সূত্রে এখন দেশের মাটি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছি বিদেশের মাটিতে।
মায়ের আশীর্বাদ রয়েছে সঙ্গে আর কোনো বাড়তি বোঝা সঙ্গে নিয়ে আসিনি!
![]() | ![]() |
|---|

এই মুহুর্তে বিদেশের নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম সেই ছোটবেলার একটি ঘটনার কথা!
তখন আমি ক্লাস থ্রি তে পড়ি, আমাদের কিছুদিনের জন্য নিজের পাড়ায় অবস্থিত বাবার দিদি অর্থাৎ আমার বড় পিসিমার বাড়িতে থাকতে হয়েছিল।
বাড়ি তৈরির কাজ চলছিল আমাদের, এক্ প্রকার সেদেই থাকার কথা সেইসময় বলেছিলেন পিসিমা!
তার দুই ছেলে তখন সবে সবে ফরেন নেভিতে যুক্ত হয়েছে, আমার বাবার কাছে থেকে এই দুই পিসতুতো দাদা ইঞ্জিনীয়ারিং এর পড়াশুনা শেষ করেছিলেন!
অবশ্য বিষয়টি আমি অনেক পরে জেনেছিলাম বাবার মুখে, সেই সময় বাবা চাকরি সূত্রে থাকতেন মুম্বাইতে!
যাইহোক, এবার সেই কিছু সময় যখন সেই পিসিমার বাড়িতে থাকতে গিয়েছিল, তখন আমাদের জায়গা হয়েছিল সিঁড়ির ঘরে!
বাড়িতে পাম্প এর জল আসলেও, আমার মা সেই টিউবয়েলের জল বয়ে এনে রোজকার কাজ কর্ম সরতেন!
কোনোদিন মা নালিশ করে নি!
সবটাই মুখবুজে সহ্য করতেন, কারণ মা জানতেন এই ব্যবস্থা সাময়িক, তবে অত ছোট অবস্থায় সে বুদ্ধি আমার মাথায় কাজ করে নি!
তাই পাড়ায় আরেক জেঠিমাকে আমার মায়ের কষ্টের কথা জানিয়েছিলাম, সেটা পিসিমার কানে চলে যাওয়ায়, সেদিন আমার মাকে যে দুর্ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছিল, সেটা আজও ভুলে যাইনি!
সেদিন কি পিসিমা ভুলে গিয়েছিলেন যে, তার স্বামী চলে যাবার পর তার ছোট ভাই অর্থাৎ আমার বাবা তার দুই সন্তানের লেখাপড়ার ভার না নিলে তার পরিস্থিতি কি হতো?
যদি আমি অত ছোট না থাকতাম, তাহলে হয়তো প্রশ্নটা করেই বসতাম!
এরপর মা আমায় বেশ করে বকুনি দিয়েছিলেন!
সেদিনের ঘটনায় মায়ের উপরে খুব অভিমান হয়েছিল, কিন্তু বড় হয়ে বুঝেছিলাম মা কেনো সেদিন আমায় শাসন করেছিলেন।
বড়রা ভুল করুক কিংবা ঠিক সেটা বড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন, শত হলেও আত্মীয় স্বজনের নিন্দা মানে তো সেই উপর দিকে থুতু ফেলার মতো!
বর্তমান সময়ে কে এসবের ধার ধারে বলুন তো?
এরকম একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছি, মনে মনে খুব তর্কাতর্কি করেছি কিন্তু মায়ের ভয়ে মুখ খুলিনি, আর সেটাই এক সময় আমার অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেলো।
এখন প্রয়োজনের বাইরে আর বিশেষ কারোর সাথে কথা বলবার ইচ্ছে করে না।
আমি খেয়াল করে দেখেছি, পরিচিত মানুষ, বিশেষ করে আত্মীয় স্বজন অধিক সমালোচনায় অংশগ্রহণ করে!
অনেকেই হয়তো বলবেন, পরিচিত মানুষ নয়তো কি অপরিচিত মানুষ সমালোচনা করবে?
এই বিদেশের মাটিতে এসে দেখেছি, ভাষায় খানিক সমস্যা হলেও সহযোগিতার প্রয়াস করেন অধিক মানুষ, তারা এই বিষয়ে চেনা অচেনার ধার ধারেন না!
এরপর মা যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, তখনও দেখেছিলাম সহযোগিতা দুরস্ত, কেউ সৌজন্যতা দেখাবার প্রয়োজন বোধ করেনি!
সময় থেমে থেকে না, কিন্তু রয়ে যায় কথা! এটা ভেবেই কি আমার নামকরণ হয়েছিল?

জানা নেই অবশ্য! তবে, অনেক স্মৃতির পাশাপশি অনেক মানুষের অনেক কথা আজ এই ভার্দার নদীর পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি!
আজ, না মা বেঁচে আছেন, আর না আমার সেই পিসিমা! তবুও সেদিনের জমা নালিশ আজও কোথাও না কোথাও জমা রয়ে গেছে!
জানিনা হয়তো, মনের এই নালিশ গুলো শব্দের আকারে বেরিয়ে গেলে খানিক অভিমান কমে যেতো, মনে মনে ভাবতাম সন্তান হিসেবে খানিক পাশে দাঁড়াতে পেরেছি মায়ের!
নাম যখন কথা, তখন শব্দের বোঝা বইতে হবে বৈকি!




