মজবুত!

তোমার পাতায় সকলেই নিজের নিজের দিনলিপি তুলে ধরে, কিন্তু আমি তোমার কাছে জমা রাখি একটি দিন থেকে অর্জিত ভাবনা, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা!
আজকে যে শব্দটি নিয়ে তোমার কাছে মনের কথা ভাগ করে নিতে এসেছি সেটা হলো, "মজবুত!"
আমরা এই একটি শব্দ প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করে থাকি,
- দুঃসময় মনোবল মজবুত রাখা!
- বাসস্থান গড়বার সময় সেটির ভিত সহ সম্পূর্ণ ছাদ মজবুত ভাবে গড়বার প্রয়াস!
- একসাথে দেশের জন্য মজবুত ভাবে সীমান্ত পাহারা, দেশের সুরক্ষার জন্য!
- শিশুর ভবিষ্যত মজবুত করতে তাকে সঠিক শিক্ষা এবং সুস্থ্য ভাবে বড় করবার প্রয়াস!
মজবুত শুধুমাত্র একটি শব্দ নয় বরং দৃঢ়তা যেটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিদিনের সংঘর্ষের রসদ সরবরাহ করে।
তবে, ডায়রি আমরা যে জায়গায় মজবুত থাকতে প্রায়শঃই ভুলে যাই, সেটি হলো বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মজবুত থাকা!
কথা দিলে, সেই কথায় অবিচল থেকে মজবুত থাকবার একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে নিজের তথা সমাজের কাছে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা।

কখনও কোনো পাখিকে দেখেছো প্রিয় ডায়রি?
একটি বাসা তৈরি করতে গিয়ে কতবার তাকে উড়ে উড়ে খড় কুটো সংগ্রহ করতে হয়?
তবুও সে অক্লান্ত পরিশ্রমের দ্বারা একটি মজবুত বাসা তৈরি করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে, নিজের পরিবারকে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য।
আজকাল, মনের কথা অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ এর চাইতেও অধিক নথিভুক্ত করি নিজের জন্য!
সব শিক্ষা, এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা, যদি সময়ের সাথে মনে না থাকে!
তখন তোমার ডাইয়ির পাতা উল্টে নিজেকে মনে করিয়ে দিতে পারবো, কোনদিন জীবন আমাকে কি শিক্ষা দিয়েছে।

আজকে, একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে গেলো, আর সেটা হলো, মজবুত শব্দটি ভালো এবং খারাপ উভয় ক্ষেত্রেই একইরকম ভাবে কার্য্যকর!
একটা গল্প দিয়ে নিজের মনের কথা তোমায় বুঝিয়ে দিচ্ছি।

অনেক দিন আগের কথা!
সে সময়, এক ব্যবসায়ী, যিনি সাথে ছিলেন একজন কৃষকও।
তো সেই ব্যবসায়ী, সময়ের সাথে জমি থেকে যে শস্য উৎপাদন করতেন, তার থেকে নিজের প্রয়োজনের টুকু রেখে বাকি ফসল সে সেবার কাজে উৎসর্গ করে দিতেন।
ঠিক একই ভাবে, কারোর অর্থের প্রয়োজন হোক, কিংবা অন্য কোনো সহায়তার সে সদাই সাহায্যের জন্য এগিয়ে থাকতেন।

এরকম একদিন তার জমিতে কাজ করা চাষীর মেয়ের বিয়ে ঠিক হলো, কিন্তু পাত্রপক্ষ একটু ভুল ভেবে সেই চাষীর মেয়ের সাথে নিজের ছেলের সম্বন্ধ করতে রাজি হলো!
আর সেটা হলো, যে জমিতে চাষী চাষাবাদ করে, সেই জমির মালিক সে নিজে।
এই ভাবনার পিছনেও সেই দয়ালু মানুষের ভূমিকা ছিল, সে ব্যবসা দেখতে ব্যস্ত থাকতেন, আর তার একমাত্র পুত্র বাবার অর্থে জমিদারি করে বেড়াতো, কাজেই গোটা জমির দায়িত্ব একনিষ্ঠ ভাবে পালন করত সেই চাষী।
স্বাভাবিক ভাবেই, সেই জমিতে কেবলমাত্র চাষীকেই দেখা যেতো।
তাই, পাত্রপক্ষ ভেবেই নিয়েছিল জমিটি সেই চাষীর। আর, যেহেতু চাষীর একটি মাত্র কন্যা সন্তান, তাই বিয়ের পর সেই জমিতে তার পুত্রের অধিকার হবে, এই আশায় সে চাষীর মেয়ের সাথে নিজের পুত্রের বিবাহে রাজি হয়ে যায়।
বিয়ের ঠিক আগেই যখন পাত্রপক্ষ সত্যতা জানতে পারে, তখন তারা চাষীর মেয়ের সাথে নিজের ছেলের বিবাহ দিতে অস্বীকার করে!
করণস্বরূপ, জানায় সে ওই জমির জন্য এই বিয়েতে রাজি হয়েছিল, কথাটি দয়ালু মানুষের কানে গেলে, সে তার সমস্ত জমি ওই চাষীকে দিয়ে দেয়, রীতিমতো আইনি প্রক্রিয়া মেনে।
তবে, পাত্রপক্ষ বিষয়টি জেনে পুনরায় বিবাহে রাজি হলেও, চাষী কিন্তু তার কন্যাকে ওই পরিবারে বিয়ে দিতে অস্বীকার করে।

ঘটনাটি যখন সেই দয়ালু মানুষের একমাত্র পুত্র জানতে পারে, তখন সে তার বাবার উপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে যায়!
বাবাকে প্রশ্ন করে, এই যে তুমি সর্বস্ব দান করে দিচ্ছ, তা তোমার কি তোমার একমাত্র ছেলে এবং এই ছোট্ট নাতির কথা মাথায় আসে না?
তোমার সন্তান হিসেবে তোমার সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আমি! কি হিসেবে আমাকে না জানিয়ে দুই একর জমি তুমি দান করে দিয়েছো ওই চাষীকে?
সন্তানের প্রশ্নের উত্তরে, সেই দয়ালু মানুষটি বলে, আমি আজ পর্যন্ত যা দান করেছি সবটাই আমার পরিশ্রম দ্বারা উপার্জিত, যে জমি আমি দান করেছি, সেই জমিতে তুমি একদিনের জন্য গিয়ে দেখিনি তার কি পরিস্থিতি, যদি ঐ চাষী না থাকত তাহলে ঐ জমির ফসল ঘরে উঠত না!
আর, রইলো বাকি বাবা হিসেবে তোমার প্রতি কর্তব্য, সেটা তো তোমাকে বড় করা, তোমায় লেখাপড়া শেখিয়ে শিক্ষিত করে, আমি আমার কর্তব্য করেছি।
আমার পুত্র, পুত্রবধূ আর আমার নাতি এরাই আমার ভবিষ্যতের পাথেয়, তাই তোমাদের সঙ্গ আমার সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ।
এরপর পুত্র সন্তান এবং পুত্রবধূ উভয়েই ক্ষুব্ধ হয়ে গেলো, সেই মানুষটির কথা শুনে, তাদের কথায় এইভাবে সব দিয়ে দিলে তো একদিন পথে বসতে হবে!
তাই, পুত্র আর পুত্রবধূ ঠিক করলো, ওই মানুষটিকে আর তাদের সাথে রাখবে না, এবং রাতের অন্ধকারে তাকে এই বলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলো, যে বাড়িটি তার ঠাকুরদার তৈরি,
তাই এই বাড়ির উপর তার অধিকার আছে, কাজেই তার বাবা নিজের ব্যবস্থা অন্যত্র করে নিক।
এদিকে খাবার সময় নিজের ঠাকুরদাদা কে দেখতে না পেয়ে ছোট্ট বাচ্চাটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে!
বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এবং সেই বৃষ্টিতে ভিজে বাচ্চাটির ধুম জ্বর এসে যায়!
অন্যদিকে গ্রামের লোকজন সেই দয়ালু মানুষটির বর্তমান পরিস্থিতির খবর পেয়ে, তার সাথে ধর্মশালায় দেখা করতে যায়।
সকলেই তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে, সেই রাতে সেই চাষীর বাড়িতে গিয়ে ওঠে মানুষটি।
অন্যদিকে, প্রচণ্ড ঝড় এবং বৃষ্টির দাপটে ভেঙে পড়ে সেই দয়ালু মানুষটির ঘরের দেয়াল, যেখানে তার ছেলে, ছেলের বউ এবং বিছানায় শুয়ে ছিল, জ্বরে আক্রান্ত নাতি।
যে ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়েছিল, তার নিচেই চাপা পড়ে যায় টাকা রাখার সিন্দুক, আর একলা হাতে ওই ধসে পড়া দেওয়ালের অংশ সরানো সম্ভব নয়, হাতে নেই টাকা, সাথে নেই মানুষ কারণ, সে কোনদিন কারোর পাশে দাড়ায় নি!
পরদিন কিছু শ্রমিক সেই বাড়ির পাশ দিয়েই যাচ্ছিল, এবং তাদের নজরে পড়ে অসুস্থ শিশু সহ বাড়ির পরিস্থিতি।
তবে, তারা সেটা দেখে সেখান থেকে চলে গেলে, সেই দয়ালু ছেলেটি তার স্ত্রীকে বলে, দেখেছো!
এদের সকলের জন্যই বাবা কিছু না কিছু করেছে কিন্তু আমাদের এই পরিস্থিতি দেখে কেমন সকলে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলো!
এটাই আমি বাবাকে বোঝাতে চেয়েছি কিন্তু উনি বুঝতেই চাইলেন না!
তবে, খানিকক্ষণের মধ্যেই তার ছেলের ধারণা পাল্টে গেল, কারণ সে দেখলো অনেক মানুষ তার বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত, এবং তারা জানালো দু ঘণ্টায় তারা তার বাড়ি ঠিক করে দেবে, সেই সময় লোকসংখ্যা কম ছিল, আর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সঙ্গে ছিল না, তাই তারা চলে গিয়েছিলেন।
সাথে অসুস্থ শিশুটির জন্য কবিরাজ ডাকতে পাশের গ্রামে যেতে হয়েছিল।
কথাগুলো শুনে ছেলেটির ধারণা পাল্টে গেলো মানুষগুলো সম্পর্কে, কিন্তু সে জানালো এই শ্রমিকদের দেবার মত অত টাকা তার কাছে নেই, এমনকি সন্তানের চিকিৎসার টাকাও নেই তার কাছে।
তখন সকলেই জানালো, তার পিতা তাদের সকলের জন্যই অনেক সহায়তা করেছেন, তাই তাদের টাকার প্রয়োজন নেই, এটা তাদের কাছে সৌভাগ্যের বিষয় যে, তারা ওই দয়ালু মানুষের পরিবারের জন্য কিছু করবার সুযোগ পেয়েছে।
বাবার কৃতকর্মের ফল এবং নিজের কৃতকর্মের ফল উপলব্ধি করে সে পিতাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে চাইলে, বাবা বাড়ি ফিরতে অস্বীকার করে! কারণ, মানুষের পরিবর্তন পরিস্থিতি অনুযায়ী নয়, অন্তর থেকে হবার প্রয়োজন।
তাই, সে তার সন্তানের থেকে বাড়িতে থাকার বিনিময়ে শর্ত রাখেন, এবার থেকে তার ছেলে পরিশ্রম করে উপার্জন করবে এবং সেও নিজের পাশাপশি প্রয়োজনীয় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যাবে নিঃশর্ত ভাবে।

সন্তান তার ভুল বুঝতে পেরে রাজি গিয়ে গেলো, কারণ এটা সে বুঝতে পেরেছে, কর্ম কথা বলে সময়ের সাথে, সেটা ভালো হোক বা মন্দ।
তাই, সব কিছুর ঊর্ধ্বে যেটাকে সবচাইতে অধিক মজবুত করবার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সেটা হলো ভালো কর্ম, কারণ কর্মই শেষ কথা বলে, যেমনটি একটি পরিবারের মধ্যেই গল্পে দৃষ্টান্ত হিসেবে পাওয়া গেলো।
সময় এবং সৃষ্টিকর্তা সবকিছুর হিসেব খুব যত্নের সঙ্গে রাখেন, সেইজন্য, নিজের খাতায় কোনটা অধিক জমা করে নিজের জীবনের খেরো খাতা মজবুত করবো, সেটা সম্পুর্ণ নির্ভর করে নিজের উপর, কি তাই না প্রিয় ডায়রি? এটাই তো জীবনের অঙ্ক! শেষটা মিলতেই হবে।

