বাঁশ বাগানের মাথার উপর!

আজকে লেখার শীর্ষক হিসেবে একটি যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত বিখ্যাত 'কাজলা দিদি' কবিতার চারটি শব্দগুচ্ছকে বেছে নিয়েছি!
নিম্নলিখিত অংশে, তুলে ধরলাম সম্পূর্ণ কবিতাটি!
বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে,
থোকায় থোকায় জোঁনাক জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?
সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;
দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?
খাবার খেতে আসি যখন
দিদি বলে ডাকি তখন,
ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?
আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?
বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?
কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!
দিদির মত ফাঁকি দিয়ে
আমিও যদি লুকাই গিয়ে
তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক'রে রবে?
আমিও নাই- দিদিও নাই- কেমন মজা হবে!
ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,
মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল।
ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে
বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,
উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,
দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্।
বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?
লেবুর তলে পুকুর পাড়ে
ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,–
রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?
কবিতা- কাজলা দিদি
-- যতীন্দ্রমোহন বাগচী!

পারলে কবিতাটি সম্পূর্ণ পড়বেন! আজকাল কবিতা পড়বার অভ্যেস হারিয়ে গেছে, তাই খানিক ইচ্ছেকৃত কবিতাটি সম্পূর্ণ তুলে ধরলাম, নিদেন পক্ষে যারা বাংলা পড়তে পারেন,
তারা কবিতাটি পড়লে হয়তো এর অন্তর্নিহিত সম্পর্কের গভীর টানের মূল্যায়ন করতে পারবেন;
ঠিক যেমনটি গতকাল আমার হয়েছিল।
গতকালের লেখায় দিনলিপি তুলে ধরতে গিয়ে কোথাও যেনো মনে হয়েছে নিজের প্রকৃত ভাবাবেগ তুলে ধরায় খামতি রয়ে গেছে!
এছাড়াও, কিছু ব্যাক্তিগত অনুভূতি সহ কিছু বিষয় থাকে যেগুলো যতটা নিজের ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব সেটা অন্য ভাষায় ঠিক মনমতো হয়ে ওঠে না!
গতকাল, আমার বড় মাসীর বাড়িতে প্রায় মিলিয়ে যাওয়া অনেকখানি বাঁশ বাগানের এক্ টুকরোকে দেখতে পেয়ে, উপরিউক্ত কবিতাটি মনে পড়েছিল!
ঠিক যেমন অতীতের সবকিছু সময়ের হাত ধরে পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তেমনি সময়ের হাত ধরে ছোট হয়ে বাঁশ বাগানটিও!

মাসির ছোট ছেলের বৌ আমাকে গতকাল জানালো, এই বাঁশ বাগানটিও তারা রাখবে না!
শুনে মনে মনে কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই অনুভূতি প্রকাশ করিনি!
যাদের থাকে, তারা উপস্থিতির মূল্যায়ন করতে পারে না, যাদের নেই তারাই সেই সকল ব্যাক্তি তথা বস্তুর মূল্যায়ন করতে পারে!
উপরের কবিতায় লেখক তার দিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, কিন্তু আমি গতকাল খুঁজেছি পুরোনো মানুষ, পুরোনো সম্পর্ক, পুরোনো স্মৃতি আর পুরোনো প্রাকৃতিক রূপকে!
গরমের ছুটিতে যখন মাসীর বাড়ি যেতাম, সেই বাড়িটি ছিল মাটি দিয়ে তৈরি!
খুব উঁচু বারান্দা, প্রায় তিনটে মাটির উঁচু উঁচু সিঁড়ি ডিঙিয়ে বারান্দায় পৌঁছতে হতো!
সেখানে বসে আমার দাদু প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের মহাভারত, আবার রামায়ন পড়ে শোনাতেন!
কাঁচের বৈদ্যুতিক একটা বাল্ব এর নিচে সকলে জড়ো হয়ে, মনোযোগ দিয়ে শুনতাম রামায়ন এবং মহাভারতের কাহিনী!
এখনো সেই মহাভারত রাখা আছে আমার মেজো মাসীর বাড়িতে!

প্রথমেই সেই বাড়িটির অভাব, এরপর তার উঠোনে থাকা একটি কাগজি লেবু গাছ ছিল, সেটার সম্পর্কে জানতে চাইলাম, মাসি জানালো, ওটা মরে গেছে!
কত লেবু হতো গাছটিতে বলে বোঝানো সম্ভব নয়! এরপর স্থানান্তরিত হয়েছে চাপকলটি!
আগেরটি নেই, পরে জায়গা পরিবর্তন করে নতুন বসানো হয়েছে!
এরপর, দুর দুরন্ত পর্যন্ত কোথাও খুঁজে পেলাম না আম বাগান! একটা কাঁচা মিঠে আম গাছ ছিল, সেটাও নেই!
বাড়ির পিছনের দিকে বৌদি নিয়ে গেলো অবশিষ্ট বাঁশ বাগান দেখাতে!
দেখলাম এক দল বাচ্চা ছেলে একটি বাঁশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে, জল নিয়ে যাবে শ্রাবণ মাসে, কচুয়া মন্দিরে তাই প্রয়োজন, সেই কথার সুবাদে জানালো আর ওই বাঁশ বাগান রাখবে না!

শহরে যেখানে কত গাছের যত্নের প্রয়োজন পড়ে, সেখানে দেখলাম এমনি এমনি কত গাছ হয়ে রয়েছে মাসীর বাড়ির চতুর্দিকে!
একদিকে যেমন ফুলগাছ, অন্যদিকে তেমনি সবজি গাছ, চাল কুমড়ো, সিম, ওলকপি, আর অনেককিছু!
আমার একদম ফিরতে মন চাইছিল না, কিন্তু দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা যেনো কোথাও অধিকারের উপর থাবা বসিয়ে দেয়!
শীতকালে যেতে বলেছে বটে আমার বৌদি, কিন্তু সবটাই নির্ভর করে, পরিস্থিতি, সময় এবং সুযোগের উপরে।
মাঝখান থেকে প্রাপ্তি ওই গাছের চাল কুমড়ো সাথে বৌদির হাতে তৈরি আম পাপড়!
ভালবাসা, আন্তরিকতা এই শব্দগুলো ক্ষমতার আড়ালে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে, এছাড়াও কেমন যেনো সুদের মায়ায় জড়িয়ে পড়ে, আসলের মূল্য দিতে আমরা ভুলে যাচ্ছি!

এক্ মায়ের পেটে জন্মগ্রহণ করে, সময়ের সাথে জীবনে আসা কিছু নতুন মানুষ, যেমন স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ইত্যাদি সুদের মায়ায়, আমাদের সেই নাড়ির সম্পর্কগুলো কেমন যেন বাঁধন হারা হয়ে যাচ্ছে!
আমার গতকাল সেটাই মনে হয়েছে, যখন ফিরছিলাম মাসীর বাড়ি থেকে!
একটা অজানা দূরত্ব তৈরি গিয়ে গেছে লম্বা বিরতির কারণে!
যতদিন আসল(মাসি)আছে, ততদিন হয়তো মন টানবে, তারপর? সবটাই অভ্যেস! আপনাদের দলছুট আত্মীয়দের ক্ষেত্রে কি একই অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি কাজ করে?


