সৃষ্টিকর্তা যখন সহায়-বাকিটা ইতিহাস!

দেখুন যারা বিজ্ঞানের আড়ালে একটি অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি অস্বীকার করেন, আজকের লেখা তাদের জন্য নয়!
তবে, ওই যে কথায় আছে,
তাই হয়তো আজও, মস্ত বড় ডাক্তার কোনো কঠিন অপারেশন করে যখন অপারেশ থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ব্যাধিগ্রস্ত পরিবারকে নিজের কর্ম সাধন এর বিবরণ দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে বলেন, তখনও কোথাও বিজ্ঞান স্বীকার করে, যুক্তি তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি শক্তি আজও বিরাজ করে।
এই যে উপরে এতগুলো শব্দ দিয়ে লেখার ভূমিকা হিসেবে তুলে ধরলাম, এটা কিন্তু কেবলমাত্র একটি পেশায় সীমাবদ্ধ মানুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়!
আজকে আপনাদের সাথে যার জীবন কাহিনী তুলে ধরতে এসেছি, অনেক ভারতীয় সহ বিশ্বের অনেক দেশ হয়তো তার গানের গুণগ্রাহী হলেও তার জীবনের সংঘর্ষের কাহিনীর সম্পূর্ণটা অনেকের জানা নেই!
"সফলতা" একটি শব্দ যেটা অনেকেই হয়তো অর্থের পরিকাঠামো দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করে, কিন্তু ওই যে গীতায় লেখা আছে আমরা কেউ কিছু নিয়ে আসিনি, আর কিছু নিয়ে যাবো না!
কাজেই, যারা আর্থিক সফলতা দিয়ে নিজেদের সফলতা বিচার করেন, তাদের কাছেও আজকের লেখার ব্যক্তিত্ব একটি উদাহরণ, যিনি আজকে হয়তো আমাদের মাঝে শারীরিক ভাবে উপস্থিত নেই, তবে তার গাওয়া গান কত প্রজন্ম ধরে রয়ে যাবে বলুন তো এই পৃথিবীতে!

এটাই তো আসল সফলতার পরিভাষা, কি তাই না? যেখানে একজন নারীর সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল মাত্র বারো বছর বয়সে!
আজকে একজন গায়িকা নয়, একজন মানুষ হিসেবে লতা মঙ্গেশকরের জীবনের কিছু অজানা তথ্য তুলে ধরতে এসেছি আপনাদের মাঝে।
দীননাথ মঙ্গেশকর একজন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ! যার ঘর আলো করে ১৯২৯ সালে প্রথম কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, যাকে আমরা লতা মঙ্গেশকর বলে চিনি!
শৈশবে বাড়িতে গানের চর্চা ছিল, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাবা কে গান গাইতে শুনতেন ছোট্ট লতা!
তবে, তখনও তার গানের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়নি, কতই বা বয়স চার কিংবা পাঁচ!
বাবা ছাত্রদের গান শেখাতেন, আর রান্না ঘরে রাখা বাসনের তাকের উপর চড়ে, কে এল সায়গল(প্রসিদ্ধ গায়ক) এর গান গেয়ে শোনাতেন মাকে!
মা বিরক্ত হয়ে বলতেন যা এখান থেকে আমার মাথা খারাপ করিস না!
কারণ এরই মধ্যে সংসারে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, জন্মেছেন, মিনা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মত কন্যারা!

এরপর, এক্ দিনের কথা, যখন দীননাথ মঙ্গেশকর এক ছাত্রকে তার শেখানো রাগ অভ্যেস করতে বলে অল্প সময়ের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন, ছাত্র গুরুর আজ্ঞা পালন করতে শেখানো গানের চর্চা করছিল, কিন্তু উঠোনে খেলতে খেলতে লতা মঙ্গেশকর গিয়ে ছাত্রকে জানালেন, সে ভুল গাইছে, তার বাবা তাকে অন্য ভাবে শিখিয়েছে, বলে নিজেই গাইতে শুরু করলেন!
পিছনে এসে বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর তার কন্যার গান শুনে, রান্নাঘরে গিয়ে তার স্ত্রী কে জানালেন, ঘরেই এতবড় গায়িকা রয়েছে, আর আমি জানতাম না!
এরপর প্রকৃত অর্থে শুরু হলো লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গীত শিক্ষা! তবে, বাবার জীবিত অবস্থায় দু একটি অনুষ্ঠান এবং শিশু শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করলেও এরপরের ধাক্কাটা ছিল অনেক বড়!

(দীননাথ মঙ্গেশকর) |
|---|
বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর মারা যাবার পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল ওই ছোট্ট মেয়েটির কাঁধে, এরমধ্যে দুই সদস্য ঊষা মঙ্গেশকর এবং একমাত্র ভাইয়ের হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের আগমন ঘটেছে সংসারে!
বাড়িতে সবজি বাজার করবার জন্য কয়েক কিলোমিটার হেঁটে স্টুডিও তে যাওয়া, সরু গলার স্বরের জন্য প্রত্যাখ্যান, একটা গোটা দিন না খেয়ে বসে থাকা, সুরকারের সাথে সাক্ষাৎকার করবার জন্য!
এমন অনেক কথা নিজের অনেক ইন্টারভিউতে বলে গিয়েছেন লতা মঙ্গেশকর নিজেই!
গতকাল তাকে ট্রিবিউট দিতে গিয়ে দুটি বিষয় এই গায়িকা সম্পর্কে জেনে ভাবলাম, সফলতা অর্জন করবার জন্য এই সংঘর্ষ তাকে সবসময় তার পা মাটিতে রাখতে শিখিয়েছিল!
গানের পাশাপশি একজন ক্রিকেট প্রেমী ছিলেন, আর ঠিক সেই কারণে, ১৯৮৩ সালে ভারত যখন ওয়ার্ল্ডকাপ জিতে ফিরেছিল, লতা মঙ্গেশকর একটি কনসার্ট করে, সেখানের সমস্ত উপার্জিত অর্থ ক্রিকেট টীমকে দিয়েছিলেন, তাদের সম্মানের জন্য!
বাংলার গায়ক মান্না দে, যাকে নিজের থেকে বড় গায়ক মনে করতেন তিনি, সফলতা পাবার পর নিজের চাইতে কাউকে বড় ভাবতে পারে কতজন বলুন তো?
মুকেশ আরেক নামকরা গায়ক যাকে নিজের বিগ ব্রাদার মনে করতেন লতা মঙ্গেশকর, যেকোনো ডুয়েট গান তার সাথে থাকলে এক্ টাকা পারিশ্রমিক কম নিতেন, বিগ ব্রাদার এর সম্মানের জন্য!
সৃষ্টিকর্তা সকলকে সংঘর্ষ দেন, কিন্তু সেই সংঘর্ষ থেকে কে কি শিক্ষায় নিজেদের শিক্ষিত করছেন, সেদিকে বোধকরি তিনি নজর রাখেন!
আর, তাই বিপুল সম্পত্তি উপার্জন করেও তিনি হাসপাতাল গড়ে রেখে গিয়েছেন, নিজের ভালবাসার মানুষকে না পাওয়ার খেদ ছিল, কিন্তু অন্য কারোর হাত আর ধরেন নি।
ওই যে শুরুতেই উল্লেখ করেছি, বিজ্ঞানের আড়ালে একটি শক্তি সদাই আমাদের কর্মের উপর নজরদারি রাখেন! যারা কিছু অর্থ উপার্জন করেই নিজেদের ভগবান ভেবে অন্যের উপকার করবার কথা ফলাও করে প্রচার করে বেড়ান, তাদের ইতিহাস মনে রাখে না, কারণ ওই প্রচারের আলোয় কর্মের গুণাগুণ ঝলসে যায়!..
প্রকৃত অর্থে কেউ কি কারোর জন্য কিছু করতে পারে? নাকি এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটি দায়িত্ব যেটি নিঃশব্দে পালন করে যাওয়ার নাম মানবিকতা!
যুগ যুগ ধরে অমরত্ব বোধহয় সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষা উত্তীর্ণ করতে পারলেই পাওয়া সম্ভব, আমার তো সেটাই মনে হয়, আর আপনাদের?
কত গায়িকা ছিল, আছে আরো আসবে, কিন্তু একজন ভালো মানুষ হতে না পারলে কি সত্যি সৃষ্টিকর্তা তার সহায় হন? আপনাদের কি মনে হয়?

