🌐 Internet Evolution Series | Part 2: ARPANET এর জন্ম
প্রথম পর্বে আমরা জেনেছিলাম, ইন্টারনেটের আগে পৃথিবী কেমন ছিল। তখন যোগাযোগের জন্য মানুষকে চিঠি, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন কিংবা রেডিওর ওপর নির্ভর করতে হতো। প্রযুক্তি এগোচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না, যার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কম্পিউটার একে অপরের সঙ্গে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে। এই সীমাবদ্ধতাই একসময় বিজ্ঞানীদের নতুন কিছু ভাবতে বাধ্য করেছিল। আর সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় ARPANET, যা আজকের ইন্টারনেটের প্রথম সফল ভিত্তি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ Sputnik 1 মহাকাশে পাঠায়। এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগতভাবে অনেকটা চমকে দেয়। তারা বুঝতে পারে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু অস্ত্রে নয়, প্রযুক্তিতেও হবে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি নতুন গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ছিল ARPA (Advanced Research Projects Agency)। এই সংস্থার মূল লক্ষ্য ছিল এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে দেশকে আরও নিরাপদ ও প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করে তুলবে।
সে সময় কম্পিউটার ছিল বিশাল আকারের এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারত না। ফলে গবেষকরা নিজেদের তথ্য বা সফটওয়্যার সহজে ভাগাভাগি করতে পারতেন না। একই ধরনের কাজ বারবার করতে হতো, যা সময় ও অর্থ দুইয়েরই অপচয় ছিল। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই ARPA এর বিজ্ঞানীরা এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেন, যেখানে দূরে থাকা একাধিক কম্পিউটার নিরাপদভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কয়েকজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে J.C.R. Licklider এমন একটি ভবিষ্যতের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন কম্পিউটার একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে এবং মানুষ যেকোনো স্থান থেকে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে। আজকের ইন্টারনেটের ধারণার সঙ্গে তাঁর সেই কল্পনার আশ্চর্য মিল রয়েছে।
তবে শুধু কম্পিউটার সংযুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হতো না। প্রয়োজন ছিল এমন একটি পদ্ধতির, যেখানে তথ্য দ্রুত এবং নিরাপদভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতে পারে। এখানেই আসে Packet Switching প্রযুক্তির ধারণা। আগে তথ্যকে একটি বড় বার্তা হিসেবে পাঠানোর কথা ভাবা হতো। কিন্তু Packet Switching পদ্ধতিতে বড় তথ্যকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে আলাদা পথে পাঠানো হয়। গন্তব্যে পৌঁছে সেই অংশগুলো আবার একত্রিত হয়ে মূল তথ্য তৈরি করে। এই পদ্ধতি নেটওয়ার্ককে অনেক বেশি দ্রুত, কার্যকর এবং নির্ভরযোগ্য করে তোলে। আজও আধুনিক ইন্টারনেট এই একই মূল নীতির ওপর কাজ করে।
অবশেষে ১৯৬৯ সালে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চারটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান UCLA, Stanford Research Institute (SRI), University of California Santa Barbara (UCSB) এবং University of Utah প্রথমবারের মতো ARPANET এর মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম কার্যকর কম্পিউটার নেটওয়ার্ক।
এই নেটওয়ার্কে পাঠানো প্রথম বার্তাটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষকরা একটি কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে "LOGIN" শব্দটি পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সিস্টেমের সমস্যা হওয়ায় মাত্র "LO" পাঠানোর পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে অবশ্য সফলভাবে পুরো শব্দটি পাঠানো সম্ভব হয়। যদিও ঘটনাটি ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এই দুটি অক্ষরই ছিল আধুনিক ইন্টারনেট যুগের প্রথম পদক্ষেপ।
পরবর্তী কয়েক বছরে ARPANET দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থা এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। গবেষকরা বুঝতে পারেন, এটি শুধু সামরিক কাজের জন্য নয়, শিক্ষা, গবেষণা এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। ধীরে ধীরে এই নেটওয়ার্কের ব্যবহার বাড়তে থাকে এবং ভবিষ্যতের আরও উন্নত নেটওয়ার্ক তৈরির পথ খুলে যায়।
যদিও ARPANET ছিল আধুনিক ইন্টারনেটের সূচনা, তবুও এটি আজকের ইন্টারনেটের মতো সহজ বা উন্মুক্ত ছিল না। সাধারণ মানুষের জন্য এটি ব্যবহারযোগ্য ছিল না এবং ওয়েবসাইট, সার্চ ইঞ্জিন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো অস্তিত্বই তখন ছিল না। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল দূরত্ব আর তথ্য আদান প্রদানের মধ্যে যে দেয়াল ছিল, প্রযুক্তি সেটি ভাঙতে শুরু করেছে।
আজ আমরা যখন কয়েক সেকেন্ডে ভিডিও কল করি, ক্লাউডে ফাইল সংরক্ষণ করি বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কাজ করি, তখন এর পেছনে ARPANET এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি শুধু একটি সামরিক গবেষণা প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল এমন একটি ধারণার বাস্তব রূপ, যা পরবর্তীতে পুরো পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বদলে দেয়।
তবে একটি প্রশ্ন তখনও রয়ে গিয়েছিল কম্পিউটারগুলো সংযুক্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ কীভাবে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবে? কীভাবে ওয়েবসাইট তৈরি হবে, আর কীভাবে একটি সাধারণ মানুষ মাত্র একটি ঠিকানা লিখেই বিশ্বের যেকোনো তথ্য দেখতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তরই আমরা জানব এই সিরিজের পরবর্তী পর্বে।
➡️ পরবর্তী পর্ব:
🌐 Internet Evolution Series | Part 3: World Wide Web
আমি আল সারজিল ইসলাম সিয়াম। আমি বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমি বর্তমানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিএসসি-র ছাত্র। আমি স্বতন্ত্র স্বাধীনতা সমর্থন করি। আমি বই পড়তে এবং কবিতা লিখতে পছন্দ করি। আমি নিজের মতামত প্রকাশ করার এবং অন্যের মতামত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমি অনেক ভ্রমণ পছন্দ করি। আমি আমার অতিরিক্ত সময় ভ্রমণ করি এবং নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে ভালোবাসি। নতুন মানুষের সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন চলার যে ধরন সেটি পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসি। আমি সব সময় নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে যখনই কোনো কিছু নতুন কিছু দেখতে পাই সেটার উপরে আকর্ষণটি আমার বেশি থাকে।
বিষয়: 🌐 Internet Evolution Series | Part 2: ARPANET এর জন্ম
কমিউনিটি : সাহিত্য ক্যানভাস
আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ জানাই এই কমিউনিটির সকল সদস্য কে, ধন্যবাদ...




High-Yield Curation by @steem-seven
Your content has been supported!
Maximize your passive income!
Delegate your SP to us and earn high rewards
Click here to see our Tiered Reward System
We are the hope!