"শুভর দাদুর মৃত্যুবার্ষিকী "
![]()
|
|---|
Hello,
Everyone,
আজ আগস্ট মাসের ৫ তারিখ। আজ শুভর দাদুর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে, সকলকে ছেড়ে চিরতরে বিদায় নিয়েছিলেন।
আজও সেই দিনটির কথা একেবারে স্পষ্ট ভাবে মনে আছে। কারণ ২০২০ সাল আমাদের প্রত্যেকের জন্য স্মরণীয়। চারিদিকে করোনা সংক্রমনের আতঙ্ক, তার উপরে লকডাউন। মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেই ভুলে গিয়েছিলেন সেই সময়।
এখন যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, সবটাই যেন কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। তবে আমরা প্রত্যেকেই সেই সময় পার করে এসেছি। হ্যাঁ বহু মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। খুব কাছের মানুষকে হারানোর পরেও, তাদেরকে অনেকেই শেষবারের জন্য দেখতেও পারেনি।
যাইহোক লকডাউন ছিলো সেই সময় ঠিকই, তবুও যেহেতু শুভর দাদু মারা গিয়েছিলেন, তাই আমাদেরকে সেই পর্যন্ত পৌঁছাতেই হতো, অন্তত শাশুড়ি মায়ের জন্য। কারন ওনার বাবাকে সারা জীবনের মতো দেখার ওটাই ছিলো শেষ দিন। তাই গাড়ি ভাড়া করে আমরা সকলেই বাড়ি থেকে রওনা করেছিলাম।
শাশুড়ি মাকে তখনও জানানো হয়নি যে, দাদু আর বেঁচে নেই। বলা হয়েছিলো শরীর খুব খারাপ, ওনার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, তাই একসাথে সকলে গিয়ে দেখে আসবো। তবে রাস্তায় যদি পুলিশ গাড়ি আটকায়, সেই কারণে শুভর ছোট মামাকে বলা হয়েছিলো দাদুর ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিতে, যাতে আমরা সেটা পুলিশকে দেখাতে পারি।
আর এইরকম পরিস্থিতিতে তখন গাড়ি ছেড়ে দিতো। তাই খুব একটা সময় নষ্ট না করে আমরা সকলে মিলেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। আমাদেরকে দুটো গাড়ি করতে হয়েছিলো, কারণ আমাদের সাথে ননদরাও সেদিন গিয়েছিলো দাদুকে দেখতে। মামাবাড়ির সামনে পৌঁছানোর পর, বাড়ির নিচে লোকের ভিড় দেখে শাশুড়ি মা আন্দাজ করেছিলেন খবর খুব একটা ভালো নয়।
গাড়ি থেকে নেমেই তিনি এক ছুটে চলে গিয়েছিলেন বাবার কাছে। এরপর যেমনটা হয় আর কি, বাবাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট, শেষবারের মতো তার সাথে কথা না বলতে পারার আফসোস, সবকিছু মিলিয়েই কষ্টটা গভীর ছিলো। আসলে সেই সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা এমন ছিলো যে, মন চাইলেই সবসময় যাওয়া আসা করা যেতো না।
প্রতিবছর এই দিনে আমাদের বাড়িতে আলাদা করে কিছু অনুষ্ঠান করা হয় না ঠিকই, তবে দাদুর ছবিতে একটা রজনীগন্ধা ফুলের মালা প্রতিবার দেওয়া হয়। এই বছর শাশুড়ি মা বাড়ি নেই ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন নিজেকে এই কাজটা করা থেকে আটকাতে পারলাম না। ভেবেছিলাম সকালের দিকে গিয়েই মালাটা কিনে আনবো। কিন্তু পরে ভাবলাম মালাটা এনে সেই মুহূর্তে ফটোতে পড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
![]() |
|---|
কারণ দাদু এবং দিদার ছবিটি আমাদের দরজার ঠিক ওপরে লাগানো, যেখানে চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে ছবিতে মালা পরানোও আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। তাছাড়া বাড়িতে কেউ ছিলো না, তাই টেবিলের উপরে চেয়ার রেখে তার ওপরে ওঠার সাহস দেখাতে পারেনি।
কোনো রকম ভাবে যদি নিচে পড়ে যেতাম, অনেক বড়ো বিপদ ঘটে যেতে পারতো। আর বাড়িতে যেহেতু কেউ ছিলো না, সেহেতু আমাকে সাপোর্ট দেওয়ার মানুষের অভাব ছিলো। আর দুর্ঘটনা যে কোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে, এটা ভেবেই বিকেলের দিকে মালা আনতে যাবো এমনটাই ভেবেছিলাম। যাতে শুভ অফিস থেকে ফিরে মালাটা পরিয়ে দিতে পারে।
দুপুর থেকে টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো, বিকেলের দিকে সেটা আরও বাড়লো। তাই ভাবলাম একেবারে সন্ধ্যা দিয়েই বেরোবো। হয়তো তখন বৃষ্টিটা একটু হলেও কমবে। কিন্তু হলো একেবারেই উল্টো। আর গত কয়েক দিন বাড়ি থেকে না বেরোতে বেরোতে, এখন যেন বাড়ি থেকে বেরোনোটাই আমার জন্য সবথেকে বড় কষ্টের একটা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কিছু সময় আসলে না বেরিয়ে আর উপায় থাকে না।
শুভকে বলতে পারতাম মালাটা আনার জন্য। তবে বৃষ্টি হচ্ছিলো, ওকে ফেরার পথে আবার একেবারে উল্টো দিকে যেতে হতো। একেতো প্রায় ভিজেই বাড়িতে আসবে, তার ওপর আরও একটা বাড়তি কাজ ওকে করতে হতো। আর তার থেকেও বড় কথা আমার নিজেরও দুটো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার ছিলো, যার জন্য ভাবলাম একেবারে বেরিয়ে সব কাজ সম্পন্ন করে, শুভর সাথেই বাড়িতে ফিরবো।
তেমনটাই করলাম। বেরোনোর আগে শুভকে জানিয়েছিলাম। ও বারংবার জিজ্ঞেস করছিলো এই বৃষ্টির মধ্যে কেন বেরোবে? কিন্তু ওকে আর আলাদা করে কিছু বলিনি। আসলে ওর হয়তো দিনটার কথা মনেও নেই, আর না থাকাটাও স্বাভাবিক। এই বিষয় গুলো আসলে বাড়ির মেয়েদেরই বেশিরভাগ সময় মনে থাকে।
যাইহোক সন্ধ্যা বেলায় বৃষ্টির মধ্যে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস একটু আগে আগেই বেরিয়েছিলাম, জানিনা আর একটু দেরি করে বের হলে হয়তো ফুলের দোকান গুলো পেতাম না। যেহেতু আগামীকাল বৃহস্পতিবার, তাই অনেকেই ফুল, বেলপাতা, আমের পল্লব, এই সমস্ত কেনেন। তাই স্টেশনের কাছে গিয়ে একটা দোকান পেয়েছিলাম। যেখান থেকে রজনীগন্ধা ফুলের মালা কিনলাম। একটা দাদুর জন্য আর একটা শ্বশুর মশাই এর ফটোর জন্য।
![]() |
|---|
একটু বড় মালা কিনতে চাইছিলাম, কিন্তু এর থেকে বড় মালা দোকানে ছিলো না। আসলে দাদুর ছবি আলাদা করে আমাদের বাড়িতে রাখা নেই। দাদু এবং দিদার ছবি একসাথে করেই বাঁধানো আছে। ছবিটা বেশ বড়, তাই ছোটো মালা আনলে সম্পূর্ণ ছবিটাতে দেওয়া সম্ভব হয় না।
শুভ অফিস থেকে আসার পর ওকে ভালোভাবে হাত মুখ ধুয়ে, তারপর ছবিটায় মালা পরিয়ে দিতে বললাম। সম্পূর্ণ ছবিটা কভার করা যাবে না এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কারণ মালাটা ছোটো। তাই ওকে বললাম দাদুর মুখটাতেই মালাটা পরিয়ে দিতে। আর অন্য মালাটা শ্বশুর মশাইয়ের ছবিতে পড়িয়ে দিয়েছিলো।
এটা আসলে কিছুই না, শুধু এমন একটা দিনকে স্মরণ করা, যখন আমরা আমাদের জীবনের একজন কাছের মানুষকে হারিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে শুভর দাদুর খুব বেশি স্মৃতি নেই ঠিকই, তবে বিয়ের পর থেকে মানুষটাকে দেখেছি, তার সাথে কথা বলেছি এবং তার মৃত্যুর পর তার প্রতি এইটুকু শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করাটা আমার একান্ত কর্তব্য বলেই মনে হয়। তাই এইটুকু প্রচেষ্টা।
আজকের দিনটাকে ঘিরে পুরনো দিনের কিছু মুহূর্ত মনে পড়লো। তাই ভাবলাম আজ না হয় সেগুলোই শেয়ার করি আপনাদের সাথে। কারণ এমন দিন আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আছে, যেদিন আমরা আমাদের খুব কাছের কাউকে হারিয়েছি। আর সেই দিনের অনুভূতিগুলো বোধহয় এরকমই হয়। আর এইরকম ছোটো ছোটো জিনিসের মাধ্যমেই, আমাদের জীবনে তাদের উপস্থিতি আমরা সেলিব্রেট করি।
যাইহোক দাদু যেখানেই আছেন, নিশ্চয়ই ভালো আছেন। ভালো থাকুন আপনারাও সকলে, এই প্রার্থনা করে আজকের লেখা শেষ করছি। ভালো থাকবেন।
![]() |
|---|



