শুধু ঘুমের কারণেই নয়, হাই এর পেছনে লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর বিজ্ঞান
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
প্রতিদিন আমরা সবাই হাই তুলি। কখনো ঘুম থেকে ওঠার পর, কখনো ক্লাসে বসে থাকতে থাকতে, কখনো দীর্ঘ মিটিংয়ের সময়, আবার কখনো অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখে নিজেরও হাই চলে আসে। এত সাধারণ একটি বিষয় হওয়া সত্ত্বেও, আমরা খুব কম মানুষই জানি যে হাই তোলা আসলে কেন হয়। অনেকেই মনে করেন, হাই তোলা মানেই শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি বা শুধু ঘুমের লক্ষণ। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। হাই তোলার পেছনে রয়েছে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, শরীরের তাপমাত্রা এবং মানুষের সামাজিক আচরণের সঙ্গে জড়িত একাধিক জটিল প্রক্রিয়া।হাই তোলা একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। সাধারণত হাই তোলার সময় আমরা মুখ বড় করে খুলে গভীরভাবে শ্বাস নিই, কয়েক সেকেন্ড সেই শ্বাস ধরে রাখি এবং তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিই। এই পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও এর সময় শরীরের বিভিন্ন পেশি, মুখমণ্ডল, গলা এবং বুক একসঙ্গে কাজ করে। গবেষকরা মনে করেন, এটি এমন একটি প্রতিক্রিয়া যা মানুষ জন্মের আগেই শিখে ফেলে। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকা ভ্রূণের মধ্যেও হাই তোলার মতো আচরণ দেখা গেছে।অনেক বছর ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছিল যে শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে মানুষ হাই তোলে। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। অতিরিক্ত অক্সিজেন গ্রহণ করলেও হাই তোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। অর্থাৎ শুধুমাত্র অক্সিজেনের ঘাটতি হাই তোলার প্রধান কারণ নয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু শারীরবৃত্তীয় কারণ রয়েছে।সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো মস্তিষ্ককে ঠান্ডা রাখা। আমাদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঙ্গ এবং এটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে। যখন দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক কাজ, ক্লান্তি বা ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে যায়, তখন হাই তোলার মাধ্যমে ঠান্ডা বাতাস শরীরে প্রবেশ করে এবং মুখ, চোয়াল ও মাথার রক্তপ্রবাহে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। এতে মস্তিষ্ক কিছুটা শীতল হতে পারে এবং তার কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য পায়। যদিও এ বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে, অনেক বিজ্ঞানী এই ব্যাখ্যাটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।হাই তোলার আরেকটি বড় কারণ হলো ক্লান্তি ও ঘুমের চাপ। যখন আমরা পর্যাপ্ত ঘুমাই না, তখন মস্তিষ্কের সতর্কতা কমে যায়। এই সময় শরীর নিজেকে আরও সচেতন বা সক্রিয় রাখার চেষ্টা করে। হাই তোলার সময় গভীর শ্বাস, পেশির প্রসারণ এবং স্নায়ুতন্ত্রের সাময়িক উদ্দীপনা আমাদের কিছুক্ষণের জন্য সতেজ অনুভব করতে সাহায্য করতে পারে। তাই রাত জেগে কাজ করার সময় বা দীর্ঘ ভ্রমণের সময় মানুষ তুলনামূলক বেশি হাই তোলে।আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজনকে হাই তুলতে দেখলে অন্যেরও হাই চলে আসে। একে বলা হয় "সংক্রামক হাই"। এটি কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের সামাজিক আচরণের একটি মজার দিক। শুধু মানুষ নয়, শিম্পাঞ্জি, কুকুর, নেকড়ে এবং কিছু অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, এটি সহানুভূতি এবং সামাজিক সংযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ আমরা যখন অন্যের আচরণ অবচেতনভাবে অনুকরণ করি, তখন সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তাই পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা কাছের মানুষের হাই আমাদের মধ্যে বেশি প্রভাব ফেলে।হাই তোলার সময় শরীরে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটে। হৃদস্পন্দনে সামান্য পরিবর্তন আসে, মুখ ও চোয়ালের পেশি প্রসারিত হয় এবং চোখে পানি চলে আসতে পারে। অনেকেই মনে করেন চোখে পানি আসা মানেই কোনো সমস্যা, কিন্তু বাস্তবে হাই তোলার সময় মুখের পেশির চাপ অশ্রুগ্রন্থির ওপর প্রভাব ফেলে বলেই এমনটি হয়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, উপস্থাপনা বা ইন্টারভিউয়ের আগে বারবার হাই আসে। এর কারণ হতে পারে মানসিক চাপ। উদ্বেগের সময় শরীরের স্নায়ুতন্ত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে এবং সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও হাই আসতে পারে। তাই হাই তোলা সবসময় অলসতা বা বিরক্তির লক্ষণ নয়। অনেক সময় এটি শরীরের স্বাভাবিক মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।প্রাণীদের মধ্যেও হাই তোলার বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সিংহ, বাঘ বা নেকড়ের মতো প্রাণীরা কখনো বিশ্রাম থেকে সক্রিয় অবস্থায় যাওয়ার আগে হাই তোলে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি দলগত আচরণের সংকেত হিসেবেও কাজ করতে পারে। অর্থাৎ হাই তোলা শুধু মানুষের নয়, বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে গড়ে ওঠা একটি সাধারণ আচরণ।তবে সব হাই স্বাভাবিক নয়। যদি কোনো ব্যক্তি সারাদিন অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত হাই তুলতে থাকেন, অথচ পর্যাপ্ত ঘুম হয়, তাহলে সেটি কখনো কখনো অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যেমন—ঘুমজনিত সমস্যা, কিছু স্নায়বিক রোগ, নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিরল ক্ষেত্রে হৃদ্রোগের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। যদিও এমন ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না, তবুও দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক মাত্রায় হাই হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।হাই কমানোর জন্য কোনো বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বরং জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনই যথেষ্ট। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানো, নিয়মিত ব্যায়াম করা, দীর্ঘ সময় একটানা কাজের মাঝে ছোট বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হাইয়ের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে। যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে কাজ করেন, তারা মাঝে মাঝে উঠে হাঁটাহাঁটি করলে এবং গভীর শ্বাস নিলে শরীর ও মস্তিষ্ক উভয়ই সতেজ থাকে।সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আপনি যদি এই লেখা পড়তে পড়তে একবারও হাই তুলে থাকেন, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ শুধু হাই সম্পর্কে পড়া, ভাবা বা কারও হাই তোলার ছবি দেখাও অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্কে একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এটাই সংক্রামক হাইয়ের এক বিস্ময়কর উদাহরণ।
সবশেষে বলা যায়, হাই তোলা কোনো অদ্ভুত অভ্যাস নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের একটি স্বাভাবিক ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় জৈবিক প্রক্রিয়া। এটি কখনো ক্লান্তির সংকেত, কখনো মস্তিষ্ককে কার্যকর রাখার একটি উপায়, আবার কখনো মানুষের সামাজিক সংযোগেরও প্রতিফলন। তাই পরেরবার কেউ হাই তুললে তাকে অলস ভাবার আগে মনে রাখবেন—তার শরীর হয়তো নীরবে নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখার কাজটাই করছে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

