উত্তরাধিকার — মায়েদের কাছ থেকে পাওয়া সেই গভীর নীরবতা
যে রাতে বুঝেছিলাম আমি আর ফিরব না—বাড়িতে না, শহরে না, যে নিজেকে এখনও বিশ্বাস করতাম বাড়ি মানে ফেরার জায়গা—সে রাতে আমি কিছুই প্যাক করিনি। শুধু কেটলিটা নিয়েছিলাম। পুরোনো, পাশে একটা দাগ, ওটা ফেলে দিয়েছিলেন তিনি আর কিছু বলেননি, শুধু তুলে নিয়ে আবার জল ফুটিয়েছিলেন এমনি করে যেন কিছুই হয়নি। ব্যাগের ভেতরটা ছিল একটা ক্ষতের মতো—যেটা আমি রাখতে চেয়েছিলাম।
ওনার একটা সংস্করণ আছে যেটা শুধু সকাল ৬টার রান্নাঘরে থাকে, পিঠটা আমার দিকে, স্টোভ থেকে ধোঁয়া ওঠে আর আলোটা তখনও ধূসর। তিনি কখনও ঘুরে তাকাননি। তাকানোর দরকার ছিল না। তিনি জানতেন আমি আছি—যেমন কেটলি জানে জল কখন ফুটেছে। না দেখে, না ভেবে, শুধু ধাতু দিয়ে ওঠা তাপটায়। আমিও শিখেছিলাম ঘরে ঢুকতে এইভাবে। এতটা স্থির হয়ে দাঁড়াতে যে নীরবতার অংশ হয়ে যাই, ব্যাঘাত না।
মনে হয় না আমি কখনও তাঁকে এটা বলেছি। যে আমি চুপ থাকতে শিখেছি ওনাকে চুপ থাকতে দেখে। যে আমাদের মাঝের দূরত্বটা শূন্যতা ছিল না—শুধু এক ভালোবাসার আকৃতি ছিল যা কথা বলে না। বা হয়তো কথা বলার দরকার ছিল, আর আমরা দুজনেই ভুলে গিয়েছিলাম, ওই বছরগুলোর কোথাও যখন তিনি দুহাতে আমার মুখ ধরে রাখতেন আর যখন তিনি শুধু চুলার দিকে ইশারা করে বলতেন "খাও।"
কেটলিটা ওনার না। শুধু একটা কেটলি। কিন্তু যখন জল ঢালি, আমার হাতটা হাতলটা ধরে ওনার মতোই—আঙুলগুলো দাগের চারপাশে জড়ায়, যেন দাগটা ইচ্ছে করেই তৈরি করা, যেন ওই আকৃতিটাই আমাকে ধরে রাখার জন্য। জানি না কেন এটা বলছি। নিশ্চিতও না যে সত্যি। হয়তো কেটলিটা কিনেছিলাম বছরখানেক পরে, ওনার চলে যাওয়ার পর। হয়তো দাগটা আমার নিজের হাতের, কোনো রাতের যা মনে নেই, কোনো রাত যখন আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। স্মৃতি এমনিই করে—যা বাঁচতে লাগে সেগুলো জমিয়ে রাখে, রসিদগুলো ফেলে দেয়। যা থেকে যায়, সেটাই তুমি বহন করতে রাজি হও।
একদিন ফোন করেছিলাম ওনাকে, মঙ্গলবার মনে হয়। চার মিনিটের কল ছিল। আবহাওয়া নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি জানতাম ওনার হাঁটুর কথা। আমরা দুজনেই অনেকবার "ঠিক আছে" বলেছিলাম। ফোন রেখে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কেটলিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিছু করার অপেক্ষায়—ফুটবে, শিস দেবে, কিছু—কিন্তু কেটলিটা খালি ছিল। জল দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। মাকে ফোন করেছিলাম শুধু ওনার শ্বাস শুনতে, আর চুলাটা জ্বালাতেও ভেবেছিলাম না।
কিছু সকালে কেটলি বসাই, জানি না কেন। এটাই তো করি। জল গরম হয়, ধোঁয়া ওঠে, আর কয়েক মিনিটের জন্য ঘরটা যেন নিঃশ্বাস আটকে রাখে—ওনি ঢুকবেন, কিছু বলবেন না—এই অপেক্ষায়। আর আমি বসে থাকি, ধোঁয়াটা উধাও হতে দেখি, আর ভাবি: এটাই আমরা একে অন্যকে দিয়েছি। কাছাকাছি থাকার একটা উপায়, ব্যাখ্যা না করেও। একটা কেটলির দাগ, যে দাগে ওনার হাতের ছাপ আছে যে কখনও আমাকে ধরে রেখেছিলেন।
জল ফুটে ওঠে। ঢালি। অর্ধেক সময় পান করি না। শুধু পড়ে থাকে, ঠান্ডা হয়, আর আমি দেখি—যেমন তিনি জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতেন—যেন এমন কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন যা আর আশা করতেন না। আমিও এখন সেটাই। যে কেটলি বসায় কারও জন্য না, আর অপেক্ষা করে।
ওনাকে কখনও জিজ্ঞেস করিনি—একা ছিলেন? আমি জানতাম উত্তরটা, তাই জিজ্ঞেস করিনি। হয়তো ঠিকই জানতাম। অথবা ভয় পেয়েছিলাম—যদি সত্যিটা বলেন, আর সত্যিটা হয় যে তিনি একা ছিলেন, এমনকি যখন আমি ঘরে ছিলাম, টেবিলের পাশে ছিলাম, আর আমি খেয়াল করিনি কারণ আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম চুপ থাকা শিখতে—ওনার শেখানো সেই চুপ।
এটাই কি—কাউকে না ধরে বহন করা? ওনাকে খুঁজে পাওয়া আমার কাপ রাখার ভঙ্গিতে, পান করার আগের থামায়, যে খালি কেটলি আমি বারবার ভরাই, যদিও কেউ আসছে না?
ওনি বলতেন, "জলকে নিখুঁত হতে হবে না। শুধু গরম হলেই হয়।" জানি না ওটা উপদেশ হিসেবে বলেছিলেন কিনা। জানি না কিছু হিসেবে বলেছিলেন কিনা। হয়তো শুধু নিজের সাথে কথা বলছিলেন, যেমন আমি এখন নিজের সাথে বলছি, যেমন আমরা সবাই বলি যখন আমাদের কঠিন কথাগুলো বলার মতো মানুষ ফুরিয়ে যায়।
তাই কেটলি বসাব। ধোঁয়া দেখব। চা পান করব না। আর আজ ওনাকে ফোন করব না—এই কারণে না যে করতে চাই না, বরং নতুন বলার কিছু নেই। আমার কাছে ওই চার মিনিট আছে। ওই আবহাওয়া আছে। ওই হাঁটু আছে।
কিন্তু এই দাগটাও আমার কাছে আছে। আর এই শব্দটা—জল কাপে পড়ার শব্দ—যে শব্দ তিনি প্রতিদিন সকালে শুনতেন, যে শব্দ মানে বাড়িতে কেউ জীবিত আছে, কেউ শুরু করছে, কেউ এখনও আছে, যদিও সে ঘুরে তাকায় না।
এখন ঢালব। ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আর বলব নিজেকে—এইটুকুই যথেষ্ট। একটা কেটলির দাগ, যে হাত ঠিক সেইভাবে ধরে, যে সকাল ফিরে আসে—এগুলো ছোট কথা নয়। এগুলোই সব। এগুলোই সব, আর আমি জানতাম না কীভাবে বলতে, যতক্ষণ না বলা বন্ধ করে দিয়েছি।
