অদৃশ্য ফোনকল

in আমার বাংলা ব্লগ14 hours ago

তখনো মেডিকেলের গণ্ডি পেরোইনি। বাসায় এলেই স্থানীয় হাসপাতালের সিনিয়র কলিগদের সঙ্গে রাতভর জরুরি বিভাগে ডিউটি করতাম। কেননা সেই সময় স্থানীয় হাসপাতালে জনবল ঘাটতি ছিল। তাছাড়া ক্লিনিক্যাল ও সার্জিক্যাল কাজগুলোতে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই মূলত সেসময় হাসপাতালে গিয়ে সারারাত জেগে থাকতাম।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি, শীতের কোন এক সন্ধ্যায় জরুরি বিভাগে রোগীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন হঠাৎই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল।

এক গুরুতর আহত রোগী কোনোরকমে জরুরি বিভাগে ঢুকেই বলতে লাগল, “আমাকে বাঁচান।” তাকে ভীষণ বর্বরভাবে মুখ, গলা এবং পিঠের নানা জায়গায় জখম করা হয়েছিল। কলের পানি যেমন প্রবল গতিতে বের হয়, ঠিক তেমনভাবেই তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল।

মুহূর্তের মধ্যেই জরুরি বিভাগের ফোনে বারবার কল আসতে শুরু করল। আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব। যে ব্যক্তি ফোন করছিল, সে শুধু বলছিল—যাই হোক, কোন অবস্থাতেই যেন রোগী সঠিক চিকিৎসা না পায়।

উঁচু-লম্বা, সুস্থ-সবল মানুষটি মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। আমার সিনিয়র কলিগ বললেন, “যেই ফোন দিক না কেন, আমাদের কাজ আমাদেরই করতে হবে—এবং দ্রুত করতে হবে।”

চোখের ভ্রু ও গালের সেলাই দিতেই আমাদের অবস্থা নাজেহাল হয়ে উঠেছিল। জরুরি বিভাগের ঘরটি তখনো আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং সঙ্গে থাকা লোকদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম।

মুখ ও ঘাড়ের সেলাই দিতে দিতেই অনেকটা সময় কেটে গিয়েছিল। এর মধ্যেই অদৃশ্য ফোন আসছিল—আর রোগীর অবস্থা জানতে চাইছিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা দুজন কলিগই কিছুটা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স আসার পর দেখি রোগীর পিঠের অবস্থা আরও ভয়াবহ—মাংস বের হয়ে এসেছে, বহু জায়গায় ফাঁক হয়ে আছে।

কোনোরকমে লিটারেচারের শক্ত কাগজ দিয়ে পিঠে সাপোর্ট, তারপর তার গেঞ্জি দিয়ে শরীরটা শক্ত করে বাঁধার চেষ্টা করলাম।

অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারকে বললাম, যত দ্রুত সম্ভব, হাসপাতালের পেছনের রাস্তা দিয়ে, সিগন্যাল লাইট বন্ধ রেখে রোগীকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্রুত নিয়ে যান।

রোগী যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই, অদৃশ্য ফোন কলের দরবেশের লোকজন হাসপাতালে এসে হাজির। যেহেতু এটি পুলিশ কেস, আমরা সবে মাত্র রেজিস্টার খাতায় লিখতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তারা উত্তেজিত হয়ে উঠল—তারা ভেবেছিল রোগী হয়তো হাসপাতালে এসেই মারা যাবে।

ঘনঘন তারা এদিক-সেদিক খুঁজতে লাগল, যেন আমরা রোগীকে লুকিয়ে রেখেছি। ওরা কিছুক্ষণ পরেই জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়েই বিড়ি টানতে টানতে কাকে যেন ফোনে বলছিল—“সমস্যা নাই ভাই, সে আপাতত এখানে নেই। মেডিকেল কলেজে গেছে। হয়তো এতক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আমরা আসছি, আপনি জায়গামতো থাকেন।”এই বলে তারা হাসপাতাল ত্যাগ করল।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ফিরে এল। তার চোখেমুখে বিষণ্নতা। সে বলল, “স্যার, অনেক রোগীই তো আনা-নেওয়া করি, কিন্তু এই রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ভাগ্য ভালো থাকলে বাঁচতে পারে, নইলে অবস্থা বেগতিক।”

এই রোগীটিকে কেনো আজও আমি মনে রেখেছি জানেন—কারণ সেদিনই প্রথম তার মুখে আমি অস্ত্রোপচার করেছিলাম।

সারারাতের ডিউটির পর সকালে হাঁটতে হাঁটতে যখন বাসায় ফিরছিলাম। তখন দেখি, গত রাতের ঘটনাটি নিয়ে পুরো শহরে পোস্টার লাগানো হয়েছে।

ভাবছিলাম—মানুষ মানুষকে এভাবে খাসির মতো কোপাতে পারে? মতবিরোধ বা সমালোচনা হলেই কি কাউকে এভাবে মারতে হবে?

গত রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন নিউজফিড দেখছিলাম, হঠাৎই সেই ভদ্রলোকের ছবি চোখে পড়ল। প্রায় দশ বছর পর তাকে দেখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম।

তাকে একটি খুদে বার্তা পাঠালাম—“সেদিন রাতে যে মানুষটি আপনাকে প্রথম প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিল, আমি সেই মানুষ। আপনার কপাল ও গালের দাগ দেখেই আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি বেঁচে আছেন—এটাই আমাকে অবাক করেছে।”

ভদ্রলোক আমাকে তার অফিসে চায়ের দাওয়াত দিলেন এবং আমার বর্তমান অবস্থার কথা জানতে চাইলেন। আমি তাকে হেসে বললাম, “চিকিৎসা পেশা অনেক আগেই ছেড়েছি। এখন শুধু উড়ে বেড়াই। বাকি জীবনটা এভাবে কেটে গেলেই হলো।”

অবশেষে তাকে টুক করে জিজ্ঞেস করলাম—“যারা আপনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, তাদের এখন কী অবস্থা? সেই অদৃশ্য ফোনকলের দরবেশ আর তার শাগরেদরা এখন কোথায়?”

2155.png