" সিকিম ট্রিপের এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হলো, ওল্ড বাবা মন্দির পরিদর্শন।"

in Incredible India2 days ago (edited)
IMG_20260728_173044_105343.jpg
"একদম ওপরে যে ঘরটি দেখা যাচ্ছে, ওটাই বাবা হরভজন সিং এর বাংকার, অর্থাৎ থাকার জায়গা ছিলো। সেটাই এখন ওল্ড বাবা মন্দির নামে খ্যাত।"

Hello,

Everyone,

চলুন আজ আমার এই পোস্টের মাধ্যমে আপনাদেরকে ঘুরে দেখাই "ওল্ড বাবা মন্দির"। দুদিন আগের পোস্টে আমি আপনাদের সাথে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। আশাকরি আপনারা সেটা সকলেই পড়েছেন।

যাইহোক কুপুপ লেক থেকে আমরা যখন গাড়ি করে ওল্ড বাবা মন্দির এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন কিছুটা এগোনোর পরেই রাস্তাটা মেঘে ঢেকে গেলো। মনে হচ্ছিল যেন কুয়াশায় রাস্তা সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে। এমনকি কয়েক হাত দূরে কি রয়েছে সেটাও ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছিলো না।

IMG_20260512_120247.jpg
"কুপুপ লেক থেকে ওল্ড বাবা মন্দিরের পথ।"
IMG_20260512_124247.jpg
"গাড়িতে বসেই বোঝা যাচ্ছে মেঘ এসে পথ ঢেকে যাচ্ছিলো।"
IMG_20260512_124311.jpg
"মেঘের জন্যে সামনের রাস্তা বোঝাও যাচ্ছিলো না। "

যাইহোক বেশ কিছুক্ষণ বাদে আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়ালো ওল্ড বাবা মন্দিরের সামনে। যেখান থেকে চার পাশের ভিউটা অসাধারণ লাগছিলো। প্রচন্ড শীতও লাগছিলো। কারণ সেখানে বেশ হাওয়া বইছিলো। আর সেই সাথে ভালো ঠাণ্ডাও ছিলো।‌ চারিদিকে সাদা সাদা বরফও দেখা যাচ্ছিলো।

IMG_20260512_121650.jpg
"ওল্ড বাবা মন্দিরের সামনে স্থাপিত ভারত মাতার মূর্তি। আর হিন্দিতে লেখা- এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত, অখন্ড ভারত।"

যাইহোক খুব বেশি দেরি না করে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম এবং গাড়ি থেকে নামার পরেই আমাদের চোখে পড়লো ভারত মাতার একটা মূর্তি, যার পাশে খুব সুন্দর ভাবে লেখা হয়েছিলো,- "এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত, অখন্ড ভারত।" সত্যিই তাই। নিজের দেশ সম্পর্কে এইরকম একটা উক্তি পড়ে সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছিলো।

IMG_20260512_124950.jpg
"মন্দিরে ওঠার জন্যে নির্মিত সিঁড়ি।"

যাইহোক এই মন্দিরে ওঠার জন্য আপনাকে একটা নির্দিষ্ট রুমে জুতো খুলে রাখতে হবে। তারপর খালি পায়ে আপনাকে উপরে উঠতে হবে। আমরা সবাই জুতো এবং মোজা সেই রুমে রেখে, তারপর ওপরে ওঠার উদ্দেশ্যে বাইরে বেরোলাম। সেই মুহূর্তে আমাদের পা গুলো একেবারেই অবশ মনে হচ্ছিলো।

IMG_20260512_125000.jpg
"সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ভীষন ঠান্ডা লাগছিলো। কারন এখানে ওঠার জন্যে জুতো, মোজা খুলতে হয়। "
IMG_20260512_125913.jpg
"সিঁড়ির পাশে জমে থাকা বরফ। আর বরফ গলা জলের জন্যে সিঁড়িতে আরও বেশি ঠান্ডা লাগে।"

প্রথমে ভাবছিলাম সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বোধহয় সমস্যা হবে, কারণ বরফ গলা জলে সম্পূর্ণ সিঁড়ি ভেজা আছে। সিঁড়ির চারপাশে জমা বরফ রয়েছে তখনও। তবে সেখানে সিঁড়ির ওপরে ম্যাট দেওয়া আছে, তাই স্লিপ কাটার কোনো ভয় নেই।

তবে বরফ গলার জল এতো বেশি ঠান্ডা যে আমাদের প্রচন্ড শীত করছিলো। কিন্তু মন্দিরের ভিতরে অংশ দেখার জন্য আমরা এতোটাই উৎসুক ছিলাম যে, সমস্ত ঠান্ডাকে উপেক্ষা করেই আমরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম এবং বলে রাখা ভালো সেই মুহূর্তে আমাদের যথেষ্ট শ্বাসকষ্টও হচ্ছিলো। একে তো অনেকগুলো সিঁড়ি পার হয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠতে হচ্ছিলো, তার উপরে প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বেশ হওয়াও বইছিলো।

IMG_20260512_125114.jpg
"মন্দিরের প্রবেশ পথ"
IMG_20260512_122657.jpg
"গলিটা কতটা সরু, আশাকরি ছবিটা দেখে বুঝতে পারছেন। "

মন্দিরের ভিতরে যখন ঢুকলাম,‌তখন বুঝতে পারলাম এটা বহু পুরনো। কারণ অনেক মোটা মোটা দেওয়াল ছিলো। সরু গলির মধ্যে দিয়ে এক এক করে আমাদের ঢুকতে হচ্ছিলো।

ঢোকার শুরুতেই আমার একটু ভয় ভয় লাগছিলো, কারণ গুহার মতন যতই ভেতরে ঢুকছি তত যেন ভয় লাগছিলো। তবে যেহেতু মানুষের ভিড় ছিলো, তাই ভয়কে উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলছিলাম। হয়তো উপরে ছবিটা দেখে আপনারা আন্দাজ করতে পারবেন যে রাস্তাটা কতটা সরু ছিলো।

IMG_20260512_122401.jpg
"বাবা হরভজন সিং এর ব্যবহৃত জামা"
IMG_20260512_122444.jpg
"হরভজন সিং এর ব্যবহৃত জুতো"
IMG_20260512_122451.jpg
"হরভজন সিং এর ব্যবহৃত পাগড়ি"

এটা আসলে বাবা হরভজন সিং এর ব্যাংকার ছিলো। এখানেই তিনি থাকতেন। সেখানেই হরভজন সিং‌ এর মূর্তি, তার ছবি, তার অর্জিত বিভিন্ন মেডেল, তার পোশাক, জুতো, মাথার পাগড়ি সমস্ত কিছু খুব সুন্দর ভাবে সংরক্ষিত করা আছে।

IMG_20260512_122446.jpg
"বাবা হরভজন সিং এর বিছানা। যেখানে তার ছবি, ব্যবহৃত হাতের বালা সবকিছুই সুসজ্জিত রয়েছে।"
IMG_20260512_122526.jpg
"হরভজন সিং এর ব্যবহৃত তলোয়ার"
IMG_20260512_122506.jpg
"হরভজন সিং এর ছবির সামনেই সকলে নিজেদের ভক্তি থেকেই প্রণামী দিচ্ছিলেন।"

এমনকি তিনি যে বিছানায় ঘুমাতেন, সেই বিছানার উপরে আজও তার ছবি রাখা। তার ব্যবহৃত তরোয়াল এবং তার হাতের চুরি সমস্ত কিছুই সুসজ্জিত ভাবে রাখা। আজ‌ও প্রতিদিন সেখানে নিয়মিত পুজো করা হয়। সত্যি কথা বলতে ছবিটি দেখে মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হলো।

কত কম বয়সে দেশের জন্য লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। তবে দুর্ভাগ্যবশত এক্সিডেন্ট এর কারণে অনেক কম বয়সে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। কিন্তু তবুও যেন দেশের প্রতি তার কর্তব্য পালনে তিনি আজও বদ্ধপরিকর।

IMG_20260512_130102.jpg
"বাবা হরভজন সিং এর মায়ের ছবি"
IMG_20260512_122626.jpg
"এই সেই প্রদীপ, যেটা সারাদিন রাত জ্বলে। এর পাশে ও অনেকে প্রণামী রেখেছেন।"

সেখানে বাবা হরভজন সিং এর মায়েরও একটা ছবি রয়েছে। বহু মানুষ সেখানে ভক্তিসহকারে প্রণামী রাখছেন। তবে সেখানে সবথেকে আকর্ষণীয় ছিলো একটি প্রদীপ। যেটা সারাদিন রাত জ্বলে। আর সেখানে ডিউটিরত অফিসারা এসে নিয়মিত সেটা চেক করেন।

IMG_20260512_130107.jpg
"বাবা হরভজন সিং এর ব্যবহৃত টেবিল, যেখানে ওনার কিছু জিনিস সুসজ্জিত রয়েছে।"
IMG_20260512_130111.jpg
"এটি ওনার ব্যবহৃত আলমারি, যেখানে ওনার নিজের নাম লেখা আছে।"

তার‌ ব্যবহৃত আলমারিটা আজও একই রকম ভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি তিনি নিজে যে চেয়ারটি ব্যবহার করতেন, সেটাও সুসজ্জিত অবস্থায় রাখা আছে। পাশের আরও একটা ঘরে গিয়ে দেখলাম সেখানে বাবা হরভজন সিং এর জন্য দুপুরের খাবারও দেওয়া আছে।

IMG_20260512_130146.jpg
"দুপুর বেলায় এই ভাবে তাকে লাঞ্চের থালা সাজিয়ে দেওয়া হয়।"

দুপুরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। তবে তারপর যখন মন্দির খোলা হয়, তখন সেই থালা দেখে মনে হয় যেন কেউ একজন খেয়েছেন। তাই তার উপস্থিতি আজও সেখানে যে বিদ্যমান একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই।

IMG_20260512_125345.jpg
"হরভজন সিং এর চেয়ার, যার উপরে ওনার একটা ছবি রাখা আছে।"
IMG_20260512_125727.jpg
"এই লাল রঙ এর দেওয়ালে বহু নাম হয়তো খোদিত আছে। তবে ঠান্ডার কারণে আমরা আর ওই অংশে গিয়ে সেগুলো পড়িনি।"
IMG_20260512_125821.jpg
"মন্দির থেকে কিছুটা দূরে এই দেওয়ালটা ছিলো। তাই দূর থেকে শুধু একটি ছবিই তুলেছিলাম।"

সত্যি কথা বলতে সম্পূর্ণ মন্দিরটা ঘোরার সময় এক অন্যরকমের অনুভূতি হচ্ছিলো। মনের মধ্যে যেন আজও তার উপস্থিতি সর্বত্র বিদ্যমান এবং তিনি সর্বত্র নিজের উপস্থিতি জানান দেন বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে। এই গল্পগুলো আগে শুনেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর বুঝলাম সব গল্পের পিছনে শুধু কল্পনা নয়, কিছু বাস্তবতাও নিশ্চয়ই থাকে।

IMG_20260728_173113_105409.jpg
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ৪ জন মিলে এই ছবিটা তুলেছিলাম

যাইহোক সেখান থেকে নামার সময় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমরা সকলেই কয়েকটা ছবি তুললাম। এমনকি সেখান থেকে নেমে নিচে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ ওপরে থাকা মন্দিরটিকে দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম এরকম একটা জায়গায় যে সত্যিই আসতে পারবো তা কখনোই ভাবিনি।

যাইহোক সবশেষে আমরা সেখানকার একটা কল থেকে হাত ধুলাম তারপর প্রসাদ নিলাম। আসলে আপনি সেখানে লাইনে দাঁড়ালেই প্রসাদ পাবেন এমনটা নয়। তার আগে আপনাকে সুন্দরভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে, তারপরেই কেবলমাত্র আপনি প্রসাদ পেতে পারেন এবং আপনি এক হাত পাতলে প্রসাদ দেবে না।

দুই হাত পেতে আপনাকে প্রসাদ নিতে হবে। মূলত সেখানে প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হয় ড্রাই ফ্রুট। আমরা সেই প্রসাদ নিলাম এবং তারপর পৌঁছে গেলাম সেই রুমে যেখানে আমরা জুতো রেখেছিলাম।

IMG_20260728_173124_105437.jpg
"একেবারে নিচে এসে গাড়িতে ওঠার আগে তোলা ছবি"

সমস্তটাই দেখতে ভীষণ ভালো লাগলো। তবে ভীষণ ঠান্ডা লাগছিলো কারণ সেখানে চারিদিকেই ভীষণ হাওয়া চলছিলো। আর আবহাওয়া ছিল প্রচুর ঠান্ডা। তার ওপরে আমরা জুতো মোজা সমস্ত কিছু খুলে, খালি পায়ে সম্পূর্ণ মন্দির প্রদক্ষিণ করে এসেছিলাম, যেটা বেশ কষ্টকর ছিলো। তবে ভালো কিছু পেতে হলে এতটুকু কষ্ট সহ্য করতেই হবে।

প্রথমে আমি ভাবছিলাম একটা মন্দির থাকা সত্ত্বেও কেন নিচে আরেকটা মন্দির করা হয়েছে। তবে এই ওল্ড বাবা মন্দির পরিদর্শন করতে এসে বুঝলাম, সকলের পক্ষে এই জায়গা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আর সারা বছর এই মন্দিরটি খোলা থাকে না।

যেহেতু প্রচুর পরিমাণে বরফ পড়ে। যে কারণে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নিচে আরও একটা মন্দির করা হয়েছে। আর এখান থেকেই তার ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস সেই মন্দিরের রাখা আছে। তবে তিনি মূলত এই ওল্ড বাবা মন্দিরেই থাকতেন।

IMG_20260512_121628.jpg
"চারপাশে তখন শীতল হাওয়া বইছে। মন্দির চত্বর ছাড়ার আগে শেষবার চারপাশের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার সময় এই ছবিটি তুলেছিলাম।"

যাইহোক খুবই ভালো লাগলো এরকম একটা জায়গা পরিদর্শন করে। এক অদ্ভুত অনুভূতিতে মনটা ভরে গিয়েছিলো। তবে ফেরার তারা ছিলো বড্ড বেশি। তাই কিছুটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে সময় কাটানোর মত সুযোগ না থাকায়, সবাই তড়িঘড়ি এসে গাড়িতে উঠলাম। সেখান থেকে আমরা রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী এবং সিকিম ট্রিপের শেষ গন্তব্য ঋষিখোলার উদ্দেশ্যে।

আর সেই সম্পর্কে না হয় পরবর্তী পোস্টে গল্প করবো। আজকের লেখা এই পর্যন্তই। কেমন লাগলো আপনাদের এই ওল্ড বাবা মন্দির সম্পর্কে জেনে এবং সেখানকার তোলা ছবিগুলো দেখে, তা অবশ্যই মন্তব্যের মাধ্যমে জানাবেন।

আপনাদের সকলের মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। প্রত্যেকে খুব ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। শুভরাত্রি।