বিদায় বেলা
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন—একটা ঋতু, ক্যালেন্ডারে যার শেষ আছে, কিন্তু হৃদয়ে যার কোনো সমাপ্তি নেই; চিরসবুজ, চিরজাগ্রত।
ক্লাসে যাওয়ার তাড়া, আবার না যাওয়ার হাজার অজুহাত; বন্ধুদের সাথে অন্তহীন আড্ডা; চায়ের কাপে ঝড় তুলে পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন—আজ সবই নরম আলোয় ভাসা স্মৃতি। তখন মনে হতো, এই দিনগুলো কবে শেষ হবে! আর এখন মনে হয়—কেন এত দ্রুত ফুরিয়ে গেল?
আমি হয়তো খুব নিয়মিত ক্লাস করা ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু আজ বুঝি—আরেকটা সুযোগ পেলে একটা ক্লাসও মিস করতাম না। সারাদিন ক্লাস করে বিকেলে পুকুরঘাটে বসে আড্ডা দিতাম, সেমিনারের নীরবতায় বইয়ের পাতায় ডুবে যেতাম। ভুট্টো ভাইয়ের সেই স্বাদহীন, গন্ধহীন খাবার—আজ মনে হয় অমৃতের মতো। রাসেল ভাইয়ের দোকানে ৫ টাকার চা খেয়ে ১০ টাকা দিয়ে চলে আসা—সেই ছোট্ট বাড়তি দেওয়াটুকুতেই ছিল অদ্ভুত এক তৃপ্তি, এক নিঃশব্দ উদারতা।
হলের সেই মুরগীর তরকারি , আজ গরুর মাংসের থেকেও বেশি সুস্বাদু লাগে স্মৃতিতে। মাঠের ফুটবল খেলা, শর্টফিস ক্রিকেটের তর্ক-বিতর্ক, লাইব্রেরিতে পড়তে যাওয়ার নাম করে রাতে হলের মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলা—সব যেন আজ এক স্বপ্ন, দূরের কোনো আলোকছটা, যাকে ছুঁতে গেলেই মিলিয়ে যায়।
ক্যাম্পাসের প্রতিটি পথ, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি করিডোর—সবকিছুতে মিশে আছে হাসি, কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের স্তর জমা ইতিহাস। পরীক্ষা ভয়ের দীর্ঘ রাত, শেষ মুহূর্তের পড়া, গ্রুপ স্টাডির নামে সীমাহীন গল্প—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ক্যানভাস। তখন বুঝিনি—এটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে নির্মল সময়।
আজ দায়িত্ব কাঁধে এসে বসেছে—গম্ভীর, ভারী। আর ঠিক তখনই সেই দিনগুলো মায়ার মতো ডাকে। মনে হয়—আহ, যদি আরেকবার ফিরে যাওয়া যেত! সেই চেনা পথে হাঁটা, সেই পরিচিত মুখগুলোর সাথে আরেকটু হাসা, আরেকটু বাঁচা…
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধু পড়াশোনা নয়—এটা নিজের ভেতরের মানুষটাকে চিনে নেওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা। আর সেই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত সময়ের সাথে সাথে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে—যেন পুরনো কোনো গানের সুর, যতবার শোনা যায়, ততবার নতুন করে হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
জীবন এগিয়ে যায়—এটাই নিয়ম, এটাই বাস্তবতার শৃঙ্খলা। তবু কিছু সময় থাকে, যা পিছনে পড়ে গিয়েও আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে—নীরবে, গভীরভাবে, অমলিন হয়ে।
ঢাকা কলেজ—তোমাকে ভালোবাসি, আজও, আগামীতেও। তুমি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নও, তুমি আমার জীবনের এক অনির্বচনীয় স্পন্দন, এক চিরন্তন অনুভব।

