একটি জাতিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে কীভাবে তাদের নেতা কিনে নিলেন পুতিন?

in #vladimirputin2 months ago

image.png

যে রামজান কাদিরভ আজ নিজেকে ভ্লাদিমির পুতিনের সবচেয়ে বিশ্বস্থ সেনা বলে দাবি করেন এবং রাশিয়ার হয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিতে প্রস্তুত, আপনি কি জানেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও এই একই কাদিরভ পরিবার রাশিয়ান সেনাদের রক্তে গোসল করার শপথ নিয়েছিল?

ককেশাস পর্বতমালার রুক্ষ ও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী চেচেনরা ঐতিহাসিকভাবেই এক লড়াকু এবং স্বাধীনচেতা জাতি। আঠারো শতক থেকেই রাশিয়ান সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে এসেছে। ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, তখন সুযোগ বুঝে চেচনিয়া নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক সোভিয়েত জেনারেল জওহর দুদায়েভ। কিন্তু মস্কো কোনোভাবেই ককেশাস অঞ্চলের এই কৌশলগত এবং তেল-সমৃদ্ধ ভূমি হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর। তৎকালীন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিন মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে চেচনিয়ায় বিশাল সেনাবাহিনী পাঠান। রাশিয়ান কমান্ড্যান্টদের অহংকার এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা ভেবেছিলেন এটি হবে এক সপ্তাহের একটি সাধারণ অভিযান।

কিন্তু গ্রোজনি শহরের সরু রাস্তাগুলো রাশিয়ান ট্যাংকগুলোর জন্য পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে। চারপাশের বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ধেয়ে আসা চেচেন স্নাইপার এবং রকেট প্রপেলড গ্রেনেডের (RPG) আঘাতে রাশিয়ান কনভয়গুলো আক্ষরিক অর্থেই জ্বলন্ত কফিনে পরিণত হয়। টানা দুই বছর চলা এই যুদ্ধে রাশিয়া চরম অপমানজনক পরাজয় বরণ করে এবং ১৯৯৬ সালে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

প্রথম যুদ্ধে হেরে গিয়ে রাশিয়া ভেতরে ভেতরে প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসছিল। ঠিক এখানেই রাশিয়ার ভুল এবং পরবর্তীতে পুতিনের উত্থানের পেছনের গল্পটি লুকিয়ে আছে।

নিকোলো মেকিয়াভেলি, তাঁর বিখ্যাত দ্য প্রিন্স বইয়ে একটি ভয়ংকর সত্য বলেছিলেন, মানুষকে হয় পুরোপুরি আপন করে নিতে হবে, নয়তো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে হবে। কারণ ছোটখাটো আঘাতের প্রতিশোধ তারা ঠিকই নেয়, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলে আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। প্রথম যুদ্ধে রাশিয়া চেচেনদের কেবল আহত করেছিল, ধ্বংস করতে পারেনি। আর সেই ভুলের মাশুল তাদের দিতে হয়েছিল।

ক্ষমতায় এসেই ভ্লাদিমির পুতিন এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেননি।

তিনি রবার্ট গ্রিনের ১৫ নম্বর সূত্রটি যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন: শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করুন। শুরু হয় দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধ। এবার কোনো আপোষ নয়। পদাতিক সেনা পাঠানোর আগে আকাশ থেকে অবিরাম বোমাবর্ষণ এবং দূরপাল্লার থার্মোবারিক আর্টিলারি দিয়ে পুরো চেচনিয়াকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ রাজধানী গ্রোজনিকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।

পুতিন বুঝতে পেরেছিলেন যে, শুধু গুলি করে একটি পাহাড়ী জাতিকে চিরকাল দাবিয়ে রাখা যাবে না। তাই ভয়াবহ এই ধ্বংসযজ্ঞের পর তিনি খেললেন ক্ষমতার সবচেয়ে ধূর্ত চালটি। রবার্ট গ্রিন তার ৪৮ লজ অফ পাওয়ার বইয়ের দ্বিতীয় সূত্রে বলেছেন, বন্ধুদের ওপর খুব বেশি নির্ভর করবেন না, বরং শত্রুদের ব্যবহার করতে শিখুন। পুতিন ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রটিই কাজে লাগালেন।

তিনি জানতেন, বন্ধুদের ক্ষমতায় বসালে তারা অনেক সময় পাওনা ভেবে অহংকারী হয়ে ওঠে বা সুযোগ পেলে বেইমানি করে। কিন্তু একজন চরম শত্রুকে যখন নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনে নতুন জীবন ও ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন বেঁচে থাকার আদিম ভয়ে তার আনুগত্য হয় প্রশ্নহীন। পুতিন প্রথম যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়া কট্টর শত্রু আখমাদ কাদিরভকে (রামজান কাদিরভের বাবা) রাশিয়ার পক্ষে নিয়ে এলেন এবং তাকেই চেচনিয়ার শাসক বানালেন।

পুতিন কাদিরভ পরিবারকে অঢেল অর্থ, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং নিজস্ব প্রাইভেট আর্মি গড়ার সুযোগ দেন, আর বিনিময়ে আদায় করে নেন আজীবনের দাসত্ব। যেই কাদিরভরা একসময় রাশিয়ার পতনের স্বপ্ন দেখতো, আজ তারাই ইউক্রেন থেকে শুরু করে সিরিয়ায় রাশিয়ার হয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধগুলো লড়ছে। এটি কোনো জাদুমন্ত্র ছিল না, এটি ছিল চরম নিষ্ঠুরতা এবং প্রবল শত্রুকে নিজের লাঠিয়াল বানানোর মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতির এক নিখুঁত প্রয়োগ।

ইতিহাসের এই পাতাগুলো শুধু রোমাঞ্চকর গল্প নয় এগুলো হলো টিকে থাকার, ক্ষমতা দখল করার এবং প্রবল শত্রুকে নিজের অস্ত্রে পরিণত করার বাস্তব উদাহরণ। মানুষের মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে এবং ক্ষমতার খেলাগুলো কতটা নির্মম হতে পারে, তা বুঝতে না পারলে জীবনের যেকোনো ময়দানেই আপনি পিছিয়ে পড়বেন।

মেকিয়াভেলি বা রবার্ট গ্রিনদের মতো মাস্টারমাইন্ডরা যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতার এই ডার্ক সাইকোলজি এবং আসল খেলাগুলোই আমাদের শিখিয়ে গেছেন। আপনিও যদি আপনার জীবনে, ক্যারিয়ারে বা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় এই নির্মম কিন্তু কার্যকরী নিয়ম এবং কৌশলগুলো প্রয়োগ করা শিখতে চান, তবে আর দেরি না করে জয়েন করুন, The Hidden Shelf (THS)-এ। আসুন, প্রচলিত মিথ্যার খোলস ভেঙে ক্ষমতার নগ্ন সত্যটা একসঙ্গে আবিষ্কার করি।