 "উপরের দিকে উঠে পতাকাটা দেখেই অন্য অনুভূতিতে ভরে উঠেছিলো মনটা" |
Hello,
Everyone,
কেমন আছেন আপনারা সকলে? আশাকরি আপনারা সকলে ভালো আছেন, সুস্থ আছেন এবং আপনাদের সকলের আজকের দিনটি অনেক ভালো কেটেছে।
নাথুলা পাস ভ্রমণের দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আজ আবার হাজির হলাম। যদিও আজ ইচ্ছে ছিলো গতকাল রাতের বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল দেখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। তবে ভাবলাম তারও আগে আপনাদেরকে একবার সম্পূর্ণ নাথুলা পাস ঘুরে দেখানো যাক।
"উপরে ওঠার সময় মাঝে মাঝে এইভাবে একটু বিশ্রাম নিয়েছিলাম আমরা" |
গত কালকের পোস্টে আপনাদের জানিয়েছিলাম ঠিক কতটা কষ্ট করে আমরা সকলে মিলে উপরে উঠেছিলাম। মাঝে মধ্যে আবার রেলিং এ বসে একটু রেস্ট করে নিয়েছিলাম। সেই সময় দু-একটা ছবি আমার বান্ধবী রাখি তুলেছিলো। কারণ সব থেকে বেশি কষ্ট আমার আর পিয়ালীরই হচ্ছিলো।
 "সাদা বরফে মোড়া এই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম" |
যাইহোক একেবারে ওপরে গিয়ে যখন চারিদিক একবার দেখলাম,তখন যেন মনে হলো কোনো এক স্বর্গীয় স্থানে চলে এসেছি। চারিদিক সাদা বরফে মোড়া। অপূর্ব সুন্দর ছিলো সেই মুহূর্তগুলো। গাড়ি থেকে নেমেই প্রথমে দূরে আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা দেখেছিলাম, সেটাই যেন আরও অনেকটা কাছ থেকে দেখলাম। আর এক অন্য অনুভূতিতে ভরে উঠল মন।
এই ছবিটিতে দূরে আবছা যে ভারতীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে এবং কয়েকটা ছোট্ট ছোট্ট ঘরের মতো রয়েছে, এই সীমানাটাই আমাদের ভারতের শেষ সীমানা। এর ঠিক পরেই চীনের সীমানা শুরু। যদিও অতোটা উপরে ওঠার অনুমতি পর্যটকদের মধ্যে কারোরই নেই। শুধুমাত্র ডিউটিরত আর্মিরাই সেখানে যেতে পারে।
 "বরফ কেটে মাঝে এই ছোট্ট রাস্তা তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য।" |
উপরের রাস্তাটা সম্পূর্ণ বরফে ঢেকে থাকে। তবে মানুষ চলাচলের জন্য মাঝখান থেকে বরফ কেটে সরু একটা রাস্তা বের করা হয়েছে। যাতে করে মানুষ চলাচল করতে পারে। তবে এই জায়গায় হাঁটাচলা করাটা সত্যিই অনেক রিস্কের। বরফ গলা জল কিংবা বরফের উপরে পা পড়লে যে কোনো মুহূর্তেই পা স্লিপ কেটে যেতে পারে।
 "লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগত সিং এর মূর্তি" |
আরও খানিকটা একটা এগিয়ে গিয়ে চোখে পড়ল লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগত সিং এর একটি মূর্তি।যিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অত্যন্ত সাহসী জেনারেল ছিলেন। ১৯৭১ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, তার অসামান্য সামরিক দক্ষতার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
আর তার এই অসাধারণ সাহসিকতার জন্য এবং ভারতীয় সেনা বাহিনীতে তার অবদানের জন্য, পরম বিশিষ্ট সেবা পদক (PVSM) এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণে ভূষিত হন। যদিও এই ইনফরমেশন গুলো আমি গুগল থেকে পেয়েছি। আপনারাও চাইলে ওনার সম্পর্কে সেখানে পড়তে পারেন।
 "আকাশের মাঝে সূর্যের উঁকি যেন পরিবেশটাকে আরও সুন্দর করে তুলেছিলো।" |
চারিদিকে অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করার মাঝখানে, মেঘের ফাঁক দিয়ে যেন এক টুকরো সূর্য উঁকি দিচ্ছিলো বলে মনে হলো। সেই সময় এই জায়গাটির সৌন্দর্য্য আরও অনেক বেশি ভালোভাবে আমরা উপভোগ করলাম। এরপর যেদিকে চীনের সীমানা আরও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিলো আমরা সেই দিকেই গেলাম।
"চিনের সীমান্ত দেখার সময় তোলা ছবি। অল্প বরফে ঢাকা পাহাড়টা চিনে অবস্থিত।" |
উপরের ছবিগুলো দেখে আপনারা হয়তো বুঝতে পারবেন, ভারতের সীমানা থেকে চীনের বর্ডার খুব একটা বেশি দূরে নয়। দূরে কম বরফে মোড়া যে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, ওটা চিনেই অবস্থিত। হয়তো ওই দেশেরও অনেক পর্যটক ওই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের সীমানা দেখতে থাকেন, ঠিক যেমনভাবে আমরা এই পাশে দাঁড়িয়ে ওদের দেশের সীমানা দেখছিলাম।
 "ডিউটিরত আর্মি অফিসার" |
তবে এখানে যে কাঁটাতারের বাউন্ডারি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এর ওই পাশে যাওয়ার অনুমতি নেই কোনো পর্যটকের। তাই এখানে আমাদের খুব বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দেয়নি কর্মরত আর্মি অফিসারেরা। আমাদেরকে সেখান থেকে দ্রুতই নেমে যেতে বলছিলেন বারংবার।
 "আমাদের কমিউনিটির নামটা যেন আরও বিশেষ হয়ে উঠেছিল ঐ মুহূর্তে।" |
নিচে নামতে গিয়ে হঠাৎ করেই পাশের একটা বিল্ডিংয়ে একটা নামে আমার চোখ আটকে গেলো। সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন ধরনের ছবি, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পোশাক পরিহিত মানুষের ছবি রয়েছে। সেইসব ছবি দিয়ে একটা দেওয়াল খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। তবে সেগুলোর থেকেও আমার যেটা বেশি নজর কেড়েছে, সেটি হলো দেওয়ালে লেখা নামটি "Incredible India (ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া)"।
আশাকরি আপনারাও ছবিটি ভালোভাবে দেখলে নামটি পড়তে পারবেন। বরফের মধ্যে ঢেকে গেলেও নামটি কিন্তু আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। আর আজকে আমাদের এই কমিউনিটিতে, যার নাম ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া আমি এই লেখাটা শেয়ার করতে পেরে আরও অনেক বেশি আনন্দিত।
"অমন সুন্দর পরিবেশে আমরা সকলে" |
যাইহোক উপরে সমস্ত দৃশ্য দেখার পর আমাদেরকে খুব বেশিক্ষণ আর উপরে দাঁড়াতে দেয়নি। তাই এবার নিচে নামার পালা ছিলো। আরও একবার সেই কঠিন পথ পেরিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। তবে অবশ্যই নামার আগে চারজন মিলে সেখানে একটা সুন্দর ছবি তুলে নিলাম, যাতে এমন অপূর্ব জায়গার একটা স্মৃতি আমাদের সাথে থেকে যায়।
"নীচে নামার সময় তোলা ছবি" |
নিচে নামার সময় অনেকেই সিঁড়ি দিয়ে নয়, বরং তার পাশে জমে থাকা বরফের মধ্যে দিয়ে নিচে নাম ছিলো। তবে আমি আর অতোটা সাহস আয়ত্ত করে উঠতে পারিনি। বিশেষ করে জুতো না থাকায় আমার আরও বেশি ভয় করছিলো। তাই অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পাশের রেলিং গুলো ধরেই আমি নিচে নামলাম।
"আরও একবার চারপাশের সৌন্দর্য্য উপভোগ করলাম।" |
নিচে নামার পরে আরও একবার পিছনদিকে ঘুরে সম্পূর্ণ নাথুলার নৈসর্গিক দৃশ্য দেখলাম। কারণ এই জায়গায় আর জীবনে দ্বিতীয় বার ফিরে আসা হবে কিনা সত্যিই জানিনা। চারিদিক বরফে মোড়া এই অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য যেন স্বপ্নের মতোই সুন্দর।যার ব্যাখ্যা কোনো শব্দে করা সম্ভব নয়।
"গাড়ির লাইন তখনও অনেক লম্বা" |
আমাদের গাড়ি অনেকটাই নিচে ছিলো, তাই হাঁটতে হাঁটতে গাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার সময় বারবার পেছন ফিরে দেখছিলাম এই অপূর্ব দৃশ্য। তারপর আমরা আমাদের গাড়িতে এসে বসলাম। আমাদের গাড়িও নিচের দিকে নামতে শুরু করলো। উপরে তখনও অসংখ্য গাড়ির লাইন। বহু পর্যটক তখনও বরফে খেলা করছিলো।
কিন্তু আমাদের খুব বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর উপায় ছিলো না। কারণ তখনও আমাদের আরও দুটো স্পট ভিজিট করা বাকি ছিলো। সেখান থেকে আমাদের নিউ বাবা মন্দির ও ওল্ড বাবা মন্দিরে যাওয়ার কথা ছিলো।
"ফেরার পথে রাস্তার দু'পাশে জমে থাকা বরফ" |
গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলো আমাদের। বরফে মোড়া পাহাড় ছেড়ে আমাদের বাড়ি চলতে শুরু করেছিলো। দূর থেকে যতদূর চোখ যায় পাহাড় গুলোকে দেখার চেষ্টা করছিলাম, আর তার সাথে ক্যামেরা বন্দি করেছিলাম কিছু মুহূর্ত।
"বেশ অনেকটা নিচে নামার পর তোলা ছবি। বরফের পরিমাণ বেশ কমে গেছে, কিন্তু পাহাড়ের সৌন্দর্য্য কমেনি এতটুকুও।" |
এরপর আবার নতুন পথে যাত্রা শুরু করলাম নিউ বাবা মন্দিরের উদ্দেশ্যে। সেখানে ঘোরার অভিজ্ঞতা পরবর্তী একটা পোস্টে অবশ্যই আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। তবে আজকে নাথুলা পাস ঘোরার দ্বিতীয় পর্বের গল্প পড়ে ও ছবিগুলো দেখে আপনাদের কেমন লাগলো, সেটা মন্তব্যের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না।
সকলে ভালো থাকবেন। শুভরাত্রি।